পরিবার নিয়ে সাজেক ভ্যালি ভ্রমণের গল্প
সাজেক ভ্যালি: মেঘ, পাহাড় আর পরিবারের সাথে কাটানো এক অবিস্মরণীয় ভ্রমণ
আর কিছু জায়গা আছে, যেগুলো বারবার ডাক দেয়, মনে জায়গা করে নেয়।
সাজেক ভ্যালি আমার কাছে ঠিক তেমনই এক জায়গা যেখানে বার বার যেতে ইচ্ছে করে।
সাজেকে এটা আমার চতুর্থবার ভ্রমণ। এর আগে আরও তিনবার গিয়েছিলাম, তবুও সাজেক কখনো একরকম লাগেনি। প্রতিবারই সাজেক আমার কাছে নতুন রূপে ধরা দিয়েছে। তবে এবারের ভ্রমণটা ছিল সবচেয়ে আলাদা এবং সবচেয়ে কাছের। কারণ এই প্রথম আমরা আমাদের পরিবারের সবাই মিলে একসাথে সাজেক ভ্রমণে বের হয়েছিলাম।
ভোর ৬টার দিকে আমরা পরিবারের সবাই মিলে একটি মাইক্রোবাসে করে বাসা থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিই। শহর তখনো পুরোপুরি জাগেনি। রাস্তা ফাঁকা, চারপাশ শান্ত। ভ্রমণের উত্তেজনা আর ভোরের নীরবতা মিলিয়ে সময়টা অদ্ভুত সুন্দরভাবে কেটে যাচ্ছিল। যদিও ভোরবেলার ঠান্ডা আর পাহাড়ি আকাবাকা রাস্তা হওয়ার কারনে মাক্রোবাসের ভেতরে অনেকের বমিটিং হচ্ছিলো।
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আমরা খাগড়াছড়ি পৌঁছে একটা হোটেলে সবাই সকালের নাস্তা করি। এরপর সাজেক যাওয়ার জন্য একটি জীপ ঠিক করি, যেটাকে স্থানীয় ভাষায় “চান্দের গাড়ী” বলা হয়ে থাকে। মজার বিষয় হচ্ছে এই গাড়ীর ড্রাইভারের নাম "বল্টূ" হওয়াতে তার গাড়ীর হেল্পারের নাম দিলাম 'নাট"। নাট আর বল্টুর সমন্বয়ে আমরা আমাদের নির্ধারিত গাড়ীতে উঠে পড়ি।
এখান থেকেই শুরু হয় খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের উদ্দেশ্য আমাদের আসল পাহাড়ি যাত্রা।
খাগড়াছড়ি শহর ছেড়ে সাজেকের পথে কিছুদূর গেলেই পাহাড়ের উচ্চতা বাড়তে থাকে। সামনের দিকে পাহাড়গুলো যেন আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। চলতে চলতে প্রথমে পথে পড়বে দিঘীনালা। সেখান থেকে আরও চললে বাঘাইহাট বাজার। এখানে বাঘাইহাট আর্মি ক্যাম্পে পর্যটকদের রিপোর্ট করে যেতে হয়।
আমরা চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি একটু দেরীতে পৌছানোর কারনে মনে মনে ভেবেছিলাম হয়তো বাঘাইহাট আর্মি ক্যাম্প থেকে সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে ছাড়া আর্মির স্কট ধরতে পারবোনা, কিন্তু ভাগ্যক্রমে আমরা সকাল ১০ঃ৩০ এর স্কট ধরতে পেরেছিলাম। এরপর আর্মি ক্যাম্পের চেকপোস্টে গিয়ে আমাদের গাড়ীর নাট (হেল্পার) আমরা কতজন সাজেক যাচ্ছি তা এন্ট্রি করালো।
খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়ার রাস্তাটা সহজ নয়, কিন্তু এই পথটাই সাজেক ভ্রমণের অর্ধেক সৌন্দর্য। পাহাড়ের গায়ে গায়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা, নিচে গভীর খাদ, চারপাশে সীমাহীন সবুজ। চান্দের গাড়ি যত ওপরে ওঠে, প্রকৃতিও তত নতুন রূপে ধরা দেয়। কখনো মনে হয় আকাশ খুব কাছে, আবার কখনো পাহাড়ের নীরবতা বুকের ভেতর ঢুকে পড়ে।
বাঘাইহাট ক্যাম্প থেকে সামনে পড়বে তিন নদীর মিলনস্থল গঙ্গারাম মুখ। সেখানেই মাসালং আর গঙ্গারাম নদী এসে মিলেছে কাসালং নদীতে। এই কাসালংই কাপ্তাই হ্রদ হয়ে কর্ণফুলীতে মিলেছে। কংক্রিটের সেতুর উপরে দাঁড়িয়ে পাহাড়ি এ নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এর পরে সাজেক ভ্যালির দিকে চলতে হবে উঁচু নিচু পাহাড়ের বুক চিড়ে। ঘন সবুজ পাহাড়ের মাঝে কালো পিচঢালা পথ, সর্পিল আঁকাবাঁকা। কোথাও কোথাও পাহাড়ের উচ্চতা এত বেশি যে উপরে উঠতে গাড়ির ত্রাহি অবস্থা, যেন দম ফুরিয়ে যাওয়ার উপক্রম।
এ পথে চলতে সড়কের দুই পাশে চোখে পড়বে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। বিশেষভাবে বাঁশের মাচানের উপর তৈরি করা এসব বাড়িঘর। সাজেক যাওয়ার পথে পড়বে মাসালং সেনাক্যাম্প। সেখানে রিপোর্ট করে একটু সামনে গেলেই মাচালং বাজার। পাহাড়ি এ বাজার সপ্তাহের বৃহস্পতি ও শুক্রবার বসে। তবে শুক্রবারে বাজারের অবস্থা থাকে বেশি জমজমাট। দূর দূরান্ত থেকে পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর মানুষেররা এ বাজারের আসেন বিকিকিনি করতে।
মাসালং বাজার থেকে সাজেকের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। তবে এ পথে পাহাড়ের উচ্চতা আরও বেশি। এখান থেকে কয়েকটা বাঁক ঘুরলে দূরে দেখা যায় সাজেক ভ্যালি। সাজেক ভ্যালির শুরুতেই রুইলুই পাড়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাজেক এর উচ্চতা প্রায় ১৮০০ ফুট। এ গ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে বেশিরভাগ ত্রিপুরা ও লুসাই।
১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রামটিই এখন সাজেক পর্যটন এলাকার মূল আকর্ষণ। রুইলুই পাড়ার শেষ প্রান্তে আছে দেশের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত বিজিবি ক্যাম্প। বিজিবি ক্যাম্প থেকে প্রায় এক কিলোমিটার সামনে কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় আরেক পাহাড়ি গ্রাম কংলাকপাড়া। এ গ্রামেও লুসাই ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস। কংলাক পাড়া থেকে ভারতের লুসাই পাহাড় খালি চোখে দেখা যায়। এ গ্রামের নিচে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের আরও কয়েকটি গ্রাম আছে। তবে এ গ্রামগুলো খুবই দুর্গম। কংলাক পাহাড়ের গোড়ায় নিঃস্বর্গের মাঝে আছে জলবুক কটেজ। সাজেকের অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য ইকো কটেজগুলোর জুড়ি নেই।
দুপুরের দিকে আমরা সাজেকে পৌঁছে যাই। রিসোর্টে চেক-ইন করে একটু বিশ্রাম নিই, তারপর ঐ রিসোর্টেই আমরা রান্না করা পাহাড়ী দেশী মুরগী, পাহাড়ী সবজি, মাছ এবং ইত্যাদি দিয়ে দুপুরের লাঞ্চ শেষ করি। পাহাড়ের কোলে বসে খাওয়ার এই অনুভূতিটা শহরের কোনো রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় না যদিও লম্বা জার্নির কারনে সবাই একটু ক্লান্ত ছিলো।
শেষ পর্যন্ত সাহস করে একে একে সবাই উঠতে শুরু করি।
আমাদের দুই ছেলে ধুলোবালির তোয়াক্কা না করে নির্ধিধায় পাহাড়ের উপরের দিকে নিজে নিজে উঠতে থাকে কিন্তু মাঝপথে এসে আমাদের দুই মেয়ে হঠাৎ ভয় পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। পাহাড়, উচ্চতা আর সিঁড়ি—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা ওদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। আমরা থেমে যাই। কথা বলি, সাহস দিই, সময় নিই।
ঠিক তখনই বুঝতে পারি, এই পাহাড়টা শুধু পাহাড় না। এটা সাহস শেখানোর জায়গা।
কিছু সময় পর দুইজনই সাহসী মেয়ের মতো আবার ওঠা শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ওরা কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে যায়। চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকিয়ে ওদের চোখে আর ভয় ছিল না, ছিল গর্ব আর জয়ের আনন্দ।
কংলাক পাহাড় থেকে নামার সময় তাদের আর কোনো কান্না বা ভয় ছিল না। তাদের ছিল আত্মবিশ্বাস।
সন্ধ্যার দিকে আমরা আস্তে আস্তে কংলাক পাহাড় থেকে নেমে সাজেকের সবচেয়ে পরিচিত জায়গা হ্যালিপেডে চলে যাই। এখানে এসে সময়ের হিসাব থাকে না। মেঘগুলো ধীরে ধীরে পাহাড় ঢেকে নিচ্ছিল, আবার কখনো সরে যাচ্ছিল। আলো কমে আসছিল, বাতাস নরম আর ঠাণ্ডা হচ্ছিল। কিছু সময় শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে দেখেছি, কিছু না ভেবে।
এরপর রিসোর্টে ফিরে যাই।
সন্ধ্যার পর বিভিন্ন রঙ এর আলোর ঝলকানি বিভিন্ন কটেজ গুলো নানা রঙ এর কালারে সাজানো গোছানো থাকে বিধায় দেখতে বেশ ভালো লাগে। রাস্তায় হাটতে হাটতে কিছুদুর পর পর দেখবেন প্রতিটা রেস্টুরেন্টে বার বি কিউ পার্টি চলছে, পানের দেখানদার হরেক রকমের মসলা পাতি দিয়ে পান বিক্রি করছে, কেউ কেউ দল বেধে গিটার হাতে গান গাইছে এসব দেখতে দেখতেই আপনার রাতের খাওয়ার সময় হয়ে যাবে।
রাতে খাবারের জন্য বের হই এবং সেই সাথে উপভোগ করি রাতের সাজেক। এখানে শহরের মতো সোডিয়াম লাইটের আলো নেই, কোলাহল নেই। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছড়িয়ে থাকা কিছু আলো আর মাথার ওপর বিশাল আকাশ। এই নীরবতা প্রথমে অচেনা লাগলেও, ধীরে ধীরে মনটা খুব শান্ত হয়ে আসে।
পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে আবার হ্যালিপেডের দিকে যাই। উদ্দেশ্য একটাই—সূর্যোদয় আর মেঘ দেখা। ভোরের সাজেক একদম আলাদা। হেলিপ্যাডে উঠেই আপনি নিজেকে আবিস্কার করবেন মেঘের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। এ এক অপরুপ সৌন্দর্য যা বলে বোঝানো যাবেনা কিংবা ক্যামারায় ধারণ করে এই সৌন্দর্যের বর্ণণা করা যাবে না। যেদিকে দুচোখ যাবে শুধু সাদা মেঘ আর মেঘ দেখবেন এরপর আস্তে আস্তে সুর্য মামা উকি দেবে। মেঘ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, সূর্য পাহাড়ের গায়ে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিছু সময় সেখানে বসেই কাটিয়ে দিই।
ফেরার পথে মসজিদের পাশ থেকে সাজেকের সৌন্দর্য দেখি। এই দৃশ্যগুলো ক্যামেরায় ধরা যায়, কিন্তু অনুভূতিটা থেকে যায় মনের ভেতর। সাজেকের এই প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের কাছে যে কেউ প্রকৃতি প্রেমিরা সাজেকের প্রেমে পড়তে বাধ্য।
রিসোর্টে ফিরে সকালের নাস্তা করি এবং আমরা তিন ভাই সাজেকের এই প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত হাটাহাটি করছিলাম। এরপর রিসোর্টে চলে আসি এবং রিসোর্ট চেক আউট করার জন্য প্রস্তুতি নিই। এরপর ধীরে ধীরে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে পুনরায় আমাদের নাট এবং বল্টুর গাড়িতে করে যাত্রা শুরু করি।
ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, সাজেক শুধু একটা জায়গা না। এটা একটা অনুভূতি। পরিবার নিয়ে একসাথে সময় কাটানোর, ভয় পেরিয়ে সাহস শেখার, আর প্রকৃতির কাছে একটু থেমে থাকার জায়গা।
এ কারণেই হয়তো সাজেক বারবার ডাক দেয় এবং বার বার যেতে ইচ্ছে করে।


















ভাইয়া আপনাকে অনেক ধন্যবাদ
উত্তরমুছুন