অবচেতন মন এবং আবেগ

১. ইনসেপশন সিনেমাটা দেখতে গিয়ে একটা লাইন শুনে ধাক্কা খেয়েছিলাম: আমাদের অবচেতন মন নাকি যুক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয় না, বরং আবেগ দ্বারাই প্রভাবিত হয়।
তাহলে তো বিশাল সমস্যা। অবচেতন মন অনেককিছুই নিয়ন্ত্রন করে। একে আমরা নিয়ন্ত্রন করতে না পারলে তো মুশকিল।
এই কথাটা যে একেবারে নতুন, তা-ও না। এন্থনি রবিন্সের বইয়েও এ নিয়ে পড়েছিলাম। উনি কিছু সমাধান দিয়েছিলেনও, কঠিন মনে হয়েছিল। আসলে অত কঠিন না; তবে অবচেতনকে নিয়ে আমার তেমন কোন বড় সমস্যা ছিলও না, সুতরাং পাত্তা দেইনি।

২. অবচেতন খুবই ক্ষমতাশালী, আবার খুবই বিপদজনক। অবচেতন আছে বলেই ভাল সিনেমা দেখে আমরা কাঁদি, যদিও জানি এটা কেবলই সিনেমা। আবার অবচেতন আছে বলেই ছ্যাঁকা এত দীর্ঘস্থায়ী, সবকিছু বুঝার, হয়ে যাবার পরও।
অবচেতনকে ব্যবহারও করা সম্ভব, এবং এ ব্যাপারে বিস্তারিত গবেষণাও আছে। ছোটবেলায় কাজী আনোয়ার হোসেনের বইয়ে এ নিয়ে একটা চিঠি পড়েছিলাম (কিভাবে ওনার লেখা একটা সাবকনশাসের বই পড়ে এক লোক দুর্ঘটনা এড়িয়েছিল), তবে আসলে বইটা কখনো পড়া হয়নি। ফাইটার জেট পাইলট এবং অনেক বড় অ্যাথলেটরা অবচেতনকে ব্যবহার করে খুব ক্রিটিকাল সময়ে, যখন কনশাস সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় নেই। সেটা আমরাও করি, কিন্তু নিয়ন্ত্রিতভাবে নয়। এ নিয়ন্ত্রন কতটা দরকার এবং আসলে কে কতটা করতে পারে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

৩. অবচেতন আছে বলেই আমাদের ইররাশনাল ভীতি থাকে। উদাহরণস্বরূপ, আমি ছোটবেলা থেকে কুকুর ভয় পাই। সচেতন মনের সাথে হাজারো রিজনিং করেও লাভ হয় নাই, কোন এক অজ্ঞাত কারণে সাবকনশাস কুকুর দেখলেই জিপিএসের মত অন্য পথ রিক্যালকুলেট করা শুরু করতো। এই ভয় এখন অনেকটাই কমেছে, তবে সেটা কেবলই সচেতন মনের ধস্তাধস্তিতে। আসলে বড় কুকুর সামনে দেখলে রাশনালিটি উবে কই জানি চলে যায়। মন খারাপ
অবচেতনের যে কি ভয়াবহ ক্ষমতা, সেটা গোরিং-রা প্রমাণিত করে গেছেন। সচেতন মনের মত অবচেতনের ডিসকাউন্ট এবং বাস্তবতা উপলব্ধির ক্ষমতা নেই; বাস্তবতা আর কৃত্রিমতার পার্থক্য সে উপেক্ষা করে; আমাদের মস্তিষ্কের পূর্ণাঙ্গ সিমুলেশন ক্যাপাসিটি অবচেতন মন না বুঝেই ব্যবহার করে।
সুতরাং এখানে গোরিং আপনাকে বছরের পর বছর বললো 'নাজিরা সেরা' বা আপনার বাবা ছোটবেলা থেকে আপনাকে বললো 'তুই অংক পারোস না', কনশাস মন না মেনে নিলেও সাবকনশাস মন মেনে নিতে থাকে। এতে প্রতিবারই বাড়তি ডিসকাউন্টের ঝামেলা সৃষ্টি হয়। এতে যে একেবারে ওই ব্যক্তি নাজিপ্রেমিক বা গণিতদূর্বল হয়ে গেল তা না, তবে উত্তরণের জন্য সচেতন মন ততটাই শক্তিশালী হওয়া লাগে।

৪. অবচেতন মনের এসব কাজকারবার পরিষ্কার প্রমান করে যে মানুষ কেন 'এফিশিয়েন্সি ম্যাক্সিমাইজিং অপটিমাল বিয়িং' না। একেবারে কোন কারণ ছাড়াই মানুষ সাবকনশাসের ফাঁদে পড়ে যায়; উদাহরণস্বরূপ মার্কেটিং এর কোগনিটিভ ডিজোন্যান্স ধারণাটা - দামী জিনিস কেনার সঙ্গে সঙ্গে দোষবোধ। খুব শক্তিশালী মানুষ হয়তো কেবল সচেতন মনের শক্তি ব্যবহার করে অবচেতনকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে, কিন্তু অবচেতনকে সরাসরি নিয়ন্ত্রন করা গেলে কি আরো ভালো হতো না?
এদিকে আমরা খালি শিখি রিজনিং, যুক্তির মাধ্যমে নিজেদের 'কুচিন্তা' মোকাবিলা। অথচ অবচেতন মন কিন্তু কাজ করছে ২৪ ঘন্টা, এবং সে চলছে আবেগে।

৫. অবচেতন আছে বলেই ধর্মের গুরুত্ব আছে, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির গুরুত্ব আছে, পরিবারের গুরুত্ব আছে। জনস হপকিনসের একটি স্টাডিতে দেখা গেছে যে, ৬০-৮০% অসুস্থতাকে প্রভাবিত করে সাইকোসোমাটিক কোন কম্পোনেন্ট। অর্থাৎ সাবকনশাস প্রোগ্রামিং। এ কারণেই লোকে বলে যে কেউ বাঁচতে না চাইলে সে বাঁচবে না (যদিও সেটা, আবারও, 'জেনারল' কেস, ব্যতিক্রম থাকে)।
আমাদের বেশিরভাগের অবচেতন মনকে সরাসরি নিয়ন্ত্রনের কোন উপায় জানা নেই, অন্তত সামাজিকভাবে আমাদের সেভাবে প্রশিক্ষিত করা হয় না। অথচ মানুষের অবচেতন মন ইমোশনালি খুব সহজেই মানুষকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে, বা গড়তেও পারে। ইনসেপশনের ফিশার সাহেবের কথাই চিন্তা করুন - তার সাবকনশাস কিন্তু কেবল একটি ছোটবেলার রেলিক দেখে প্রভাবিত হয়েছিল।
তাই বলে অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রন করার যে কোন উপায় নেই তা না, তবে তা অনেক জটিল। যা বললাম, আমরা মূলত সচেতন মনকেই ব্যবহার করি, যেটি মূলত আধাখেঁচড়া ধরনের সমাধান। অবচেতনকে নিয়ন্ত্রন করতে ওই পর্যায়ে যাওয়া লাগে, আধুনিক, ব্যস্ত মানুষের জন্য যেটা খুব সহজ কোন কাজ নয়।

মন্তব্যসমূহ

Popular Post

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতাসমূহ

রাঙ্গামাটি ভ্রমণ গাইড ( Rangamati vromon guide )

কাপ্তাই ভ্রমন ( Kaptai )

মানসিক,স্নায়বিক,মাথাব্যাথা,মৃগিরোগ,মাদকাশক্তি ইত্যাদিতে ভোগান্তি? তাহলে পড়ুন এই পোস্ট।

জ্বিন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন (জ্বিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস) বইটি পড়ুন

পলওয়েল পার্ক ( Polwel Park )

১০০ বছর আগে ঢাকার কিছু দুর্লভ ছবি (Some rare pictures of Dhaka 100 years ago)

চন্দ্রনাথ পাহাড় ( Chandranath Hill )