মনমোহিনী এখন হিজাবের অবরোধবাসিনী


১৯৮২ সাল। রাজশাহীর কাছে খুব প্রাচীন গ্রাম আড়ানির শতাব্দীপুরনো মনমোহিনী হাইস্কুলের হিরণ্ময় বর্ষ পূর্তি। আয়োজকের নাম মুকুট।রাজশাহী ইউনিভার্সিটির ইংরেজির এই ভাবালুতাগ্রস্ত তরুণ আড়ানী কলেজে ঢুকে সমাজসেবায় মন দিয়েছে।তারসঙ্গে এক উন্মূল উদবাস্তু কবি বুলবুল।সেও কলেজে পড়ায় ছাত্রাবস্তায়,তার মুদ্রা দোষ অস্থিধারণ শব্দবন্ধটি।
 আয়োজনে কমতি নেই।প্রায় শান্তি নিকেতনের আমেজ।বেশ কয়েকজন শুভ্র দাড়ির রবীন্দ্রনাথ-লালন ঘোরাঘুরি করছেন। এরা খুব সম্ভব প্রথম দিকের ছাত্র। কে জানে হয়তো বেহেশত থেকে প্যারোলে এসেছেন। কিংবা আড়ানীর ডেভিড কপারফিল্ড বুলবুল প্লানচেট করে তাদের সবুজ মাঠের ওপর রেশমী চাঁদোয়ার নীচে আটকে রেখেছেন। লোকজন লন্ডন-ওয়াশিংটন থেকেও এই মনমোহিনী মেলায় এসেছে।
এই স্কুলের নানাবয়েসের ডাকসাইটে সুন্দরীরাও উপস্থিত।গার্লস স্কুল তৈরীর আগে বড়াল নদীঘন উতসবের গ্রামটির মোহিনীরা এই কোএডুকেশনে পড়তো। ৭৫এর পরে বাংলাদেশ পাকিস্তানের পথে গেলে গ্রামে গ্রামে গার্লস স্কুল তৈরী করে নানের মতো মাথায় ওড়না পেচিয়ে পানখেকো হুজুর হেডমাস্টারদের জেলখানায় ভরে ফেলা হয়।
যে গ্রামের মেয়েরা অর্ধশতক আগে কো এডুকেশনে পড়তো এখন তারা একধরনের গার্লস মাদ্রাসায় পড়ছে।গত বিএনপি জামাত আমলে সেই মেয়েদের স্কুলে হিজাব পরা মেয়ের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ। যাদের মা-খালারা হিজাব পরেনি তার এখন কিসের নেশায় হিজাব পরছে,কে বা কারা এইভাবে বেগম রোকেয়ার সুলতানার সপ্নটিকে আবার অবরোধবাসিনী করছে,সেসব খবর রাখার ফুসরত নেই তাদের যারা ক্ষমতা দখলের আর দেখানোর অসুস্থ বাঘ-ঘোড়া দৌড়ে মরিয়া।
রাষ্ট্রীয় দর্শনটা এরকম বাসররাতের আগে যেন নারীপুরুষ কেউ কারো মুখ না দেখে। এই ধরনের নিসর্গ বিরোধী বিকৃত শিক্ষা ব্যবস্থা ইভটিজিং এবং আত্মহত্যার ধূসর ছবিগুলোর রেসিপি দিয়েছে। মনমোহিনী স্কুল থেকে মোহিনীরা চলে গেল মনেরা বিষণ্ণ মনে অংক করে,বিজ্ঞান পড়ে,কবিতা পড়ার ইচ্ছেটায় ঊড়ে যায়।ফলে ৮২র বাসন্তী গোধুলিতে যখন ষাটের সত্তুরের সুচিত্রা-কবরীরা রবি ঠাকুরের লাবণ্যের মত নন্দন রূপের ঝলকে ষাটের সত্তুরের মন উত্তম-রাজ্জাকদের জানান দেন আজ সন্ধ্যায় এই স্কুলটা আবার মনমোহিনী হয়ে উঠবে। পরিতাপের বিষয় মোহিনীদের মেয়েরা ওড়নাটোড়না টেনে এমনভাবে বসে আছে যেন এরা আরবের শেখেদের বৌমণি হবে।১৯৮২র কথা ভেবে অবাক হই।ওইদিন বিকেলে জিয়া-এরশাদের জামায়াত বান্ধব ষড়যন্ত্রে পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করা দেশটাকে দেখলাম পাশাপাশি লিবেরেল হাসিখুশী মা আর রক্ষণশীল গোমড়া মুখো কিশোরীদের বসে থাকতে দেখে।
এই অপূর্ব আয়োজনে রবি-নজরুল-লালন-আব্বাসুদ্দীন চর্চা আর মজার মজার স্মৃতিচারণেররসে সারাক্ষণ হাসি আর সুখের হুল্লোড়ে আকাশের তারাগুলো টুপটাপ করে ঝরে পড়ছিল নকশী চাঁদোয়ার চারপাশে।শুধু গম্ভীর হয়ে বসেছিল কয়েকজন আরব শেখের হবু বৌমনি।তবে মসজিদের আজান বা মন্দিরের ঘন্টা শুনে একবারো থামেনি ওই মনমোহিনীউতসব।

দ্য মেকিং অব দ্য আউল

৮২ সালের একটি গ্রামের ইস্কুলের রিইউনিয়ন আর বদলে যাওয়া সমাজের প্রতিবেদন শেষে একটু হলুদ সাংবাদিকতা।
ক্যাডেট কলেজ থেকে পালিয়ে গ্রামের বাড়ির এই স্কুলটিতে কিছুদিন পড়েছিলাম। আড়ানীর দিনগুলোতে ঐ রিইউনিয়ন আয়োজক দুই মামা জোর করে তলস্তয় পড়াতেন,কুমার পাড়ায় নিয়ে যেতেন মৃতপাত্রের শিল্পীদের কাজ দেখতে।কিন্তু ভিসি আরে অমিতাভ বচ্চনের ছবি দেখতে খুব বাধা দিতেন,ভাবতেন আমাকে তারা যে শিল্পসম্মত বিনোদন দিচ্ছেন তাতেই খুশী থাকতে হবে।আর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছিল এই দুই পাঁড় আতেলের হাই-থট গল্প শোনা। তাদের আলোচনা রোবনাথ থেকে দস্তয়ভোস্কি।তাদের সংগঠনের নাম ছিল উন্মেষ।সেখানে গান শিখতে তাদের স্নিগ্ধ প্লেটনিক বিপন্নতার মানসপ্রিয়ারা আসতো।তারা নীল রেশমি শাড়ীর সাথে ঘাসটিপ পড়তো,আর আমার সমান বয়েসী মেয়েরা ছিল গোমড়ামুখো হুজুরাইন।আমার সঙ্গে তাদের যেন শুধু ভূগোলের নোটের সম্পর্ক।হিজাব দিয়ে নান্দনিক মানবী ভূগোল যারা ঢেকে রাখে তাদের কেন ভূগোলের নোট দেব।দিয়েছিলাম দাঁতভাঙ্গা ইংরেজীর নোট যাতে আর কোনদিন ওই রক্ষণশীল নানেরা পেঁচার মুখদর্শন না করে।মুকুট-বুলবুল মামার নারী ভাগ্যে ঈর্ষা কাতর ছিলাম।
ওই অনূষ্ঠানের আগের দিন উনারা ব্যস্ত ছিলেন,ওই ফাঁকে জওয়ানি জানেমান দেখতে ঢুকে পড়েছিলাম হাটচালার ভিসি আর প্রেক্ষাগৃহে।হঠাত কানের কাছে ফিসফিস,বাইরে বুলবুল মামা অপেক্ষা করছেন। উনি বকাঝকা দেবার লোকনা। শুধু বললেন,আমরা কলকাতা থেকে সত্যজিত রায়ের ছবিগুলোর ক্যাসেট আনানোর চেষ্টা করছি। সেগুলো এইখানে না স্কুলে দেখা হবে। বুঝলাম এজায়গাটা ছাড়তে হবে।ওই দুই আতেলের পাল্লায় পড়ে জীবনটা শান্তি নিকেতন ক্যাডেট কলেজ হয়ে ঊঠছিল।
আয়োজক হিসেবে দুজন সবসময় একশোতে একশো,কিন্তু বিনোদক হিসেবে মাইনাস একশো। মুকুট মামার হাফ শার্টের পকেটে একটা গোল্ডলিফের প্যাকেট ছিল।রিইউনিয়ন চলাকালে সেটা আমি দেখতে পেলাম,আর কেউ দেখতে পায়নি,কারণ আড়ানী গ্রামের মানুষ ফালতু জিনিষ দেখতে যায়না। মুকুট-বুলবুলের ভালোকাজ গুলোতে তারা মুগ্ধ। কিন্তু আমি তখন এক হিংসুটে ছোট বাঘ,মনটা যথারীতি পেঁচা।
পেঁচার হলুদ ব্রেকিং নিউজ
মোহিনী মাখালাদের সারিতে গিয়ে পুট করে লাগিয়ে দিলাম,মুকুট মামা টিচার হয়েছেন,সিগেরেট খাচ্ছেন খান। কিন্তু সাদা সার্টের বুক পকেটে লাল গোল্ডলিফের প্যাকেট রেখে সেতা বৃদ্ধ আর কিশোরদের দেখানোটা আশা করা যায়না। মুহূর্তে মোহিনিখালাদের হাসি উবে গেল।মুকুট মামা ওইদিকে এসে কারো প্রশংসা তো দুরের কথা কোন রিফ্লেক্স পাচ্ছেন না। কেউ তাকে কিছু বললো না,শুধু গম্ভীর হয়ে গেলো।হাসতে শুরু করলো হিজাব কিশোরীরা। অবশ্য জায়গাটা এত ভদ্র কেউ আর কিছু কাউকে বলল না। কয়েকদিন পর পরিস্থিতি ঠিক হল। কিন্তু আমার বাতিঘর মুকুট মামার ডিফেমেশন করে পেঁচা রাজশাহি কলেজিয়েট স্কুলে গিয়ে ভর্তি হল। তখন আর স্কুল পালিয়ে অলকা সিনেমা হলে গিয়ে চায়নিজ কুম্ফুকারাত দেখতে বাধা দেবার কেউ নেই।বলা বাহুল্য ওইটিই ছিল পেঁচার সাংবাদিক জীবনের প্রথম হলুদ ছক্কা। অবশ্যই খানিকটা অনুতাপের বিষয়।

মন্তব্যসমূহ

Popular Post

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতাসমূহ

রাঙ্গামাটি ভ্রমণ গাইড ( Rangamati vromon guide )

কাপ্তাই ভ্রমন ( Kaptai )

অবচেতন মন এবং আবেগ

মানসিক,স্নায়বিক,মাথাব্যাথা,মৃগিরোগ,মাদকাশক্তি ইত্যাদিতে ভোগান্তি? তাহলে পড়ুন এই পোস্ট।

জ্বিন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন (জ্বিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস) বইটি পড়ুন

পলওয়েল পার্ক ( Polwel Park )

১০০ বছর আগে ঢাকার কিছু দুর্লভ ছবি (Some rare pictures of Dhaka 100 years ago)

চন্দ্রনাথ পাহাড় ( Chandranath Hill )