পিতা মাতার রেখে যাওয়া সম্পদে মেয়েদের প্রাপ্য : আমাদের তামাশা

আমাদের চট্রগ্রামে একটি বিষয় প্রচলিত আছে (এ বিষয়ে সারাদেশের অবস্থা জানা নেই)। তা হলো, মেয়ে বিয়ে দেয়ার পর সাধারণ যৌতুক বাদে বেয়াই বাড়ী মানে মেয়ের শশুর বাড়ীতে পরবী পাঠানো। পরবী মানে হচ্ছে বিভিন্ন ইস্যুতে উপঢৌকন পাঠানো। যেমন : কুরবাণী ঈদে গরু/মহিষ/ছাগল এবং সাথে মসলাপাতি, মহরহমের সময় খিচুড়ী/পোলাউ এবং বড় বড় মোরগ/মুরগীর রোস্ট, শবে বরাত(?)/শবে ক্বদরে হালুয়া রুটির সাথে গরু ছাগলের গোস্ত, রমজান মাসে নানান পদের ইফতারী, ঈদে পরিবারে সকল সদস্যের জন্য কাপড়-চোপড়, ভাদ্র মাসে তালের পিঠা, শীতে ভাপা পিঠা-খেজুরের রস, বৈশাখ-জৈষ্ট্য মাসে আম-কাঁঠাল সহ সব ধরণের মৌসুমী ফল-ফলাদি, মেয়ে সন্তান সম্ভবা হলে গুরা পিঠা, সন্তান ভূমিষ্ট হলে আকীকার জন্য গরু-ছগাল সহ আরো কতো কি এবং মজার বিষয় হলো- চট্রগ্রামের আব্দুল জব্বারের বলী খেলার মেলা হতে নানা রকমের সামগ্রীও থাকে এই পরবীতে।

এসব পরবীর পরিমান কত হতে পারে? গরু ছাগল এবং কাপড় চোপড় বাদে বাকী সামগ্রীসমূহ পাঠানোর জন্য মেক্সিমাম ট্রাক এবং মিনিমাম ঠেলা গাড়ী প্রয়োজন হয়। ক্ষেত্র বিশেষে একাধিক ট্রাক/ঠেলাগাড়ীও প্রয়োজন হয়ে পড়ে অনেক সময়।

লিচ্চর টাইপের ছেলে এবং ওদের মা-বাবারা এসব পাওয়ার জন্য দারুন উদগ্রীব থাকে। এসব পাওয়া এবং তা অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে বিলি বন্টন করতে পারা যেন ওদের সামাজিক উচ্চাসনের প্রতীক। তাইতো অনেক সময় ছেলেপক্ষ থেকে ফরমায়েশ দেয়া হয় কি কি আইটেম কত পরিমান দিতে হবে।

গত বছর কুরবানী ঈদের কয়দিন আগে আমার এক প্রবাসী বন্ধুর সাথে দেখা হতেই খুশীতে যেন গদ গদ হয়ে অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই বললেন, ভাই মেয়ের শশুর বাড়ীতে এক লাখ বিশ হাজার টাকা দিয়ে গরু এবং আরো দশ হাজার টাকা দিয়েছি মসলা পাতি এবং পরটা ইত্যাদরি জন্য। আমি বললাম, দেখেশুনে মেয়েটা এমন গরীব ঘরে বিয়ে দিলেন কেন? আমার প্রশ্ন শুন ভদ্রলোক ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে গেলেন এবং তার বেয়াইর বাড়ী গাড়ী আর সম্পদের হিসাব দেয়া শুরু করেছেন। সব শুনে বললাম, এতবড় ধনী লোক আপনার গরু দিয়ে কেন কুরবানী করবেন? শেষমেষ বললেন আমাদের ধর্মেইতো আছে.........। ধর্মে কি আছে তা আর জিজ্ঞেস করিনি। কারন উজবুক টাইপের আরো কিছু একটা বলে বসতে পারে।

আমি দেশে এসেছি সংবাদ পেয়ে আমার বাল্যকালের এক বন্ধু ছুটে এসেছে। বেচারা লেখা পড়া বেশী করতে পারেনি, একটা ছোট চা'দোকান চালিয়ে কোন রকম জীবিকা নির্বাহ করে চলেছে। সামনে কুরবাণীর ঈদ, মেয়ের শশুর বাড়ীতে একটা ছোট গরু হলেওতো দিতে হবে, এজন্য আমার সাহায্য প্রার্থী। ওর কথা শুনে মেজাজটা খারাপ হলেও নিজেকে সংবরণ করে বললাম, তোমার নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়ে মেয়ের শশুর বাড়ীতে গরু দেয়া কি খুবই জরুরী? সে বলল্লো, পয়সাওয়ালারা এভাবে দিয়ে দিয়ে গরু ছাগল দেয়াটা অনেকটা বাধ্যতামূলক বিষয়ে পরিনত করেছে। গরু দিতে না পারলে মেয়ের শশুর বাড়ীতে মুখ দেখাবো কি করে? তাছাড়া মেয়েটাকে শশুর বাড়ীতে নানা রকম খোঁটা দিয়ে জর্জরিত করে ফেলবে। ওর কথাটা যে একেবারে খাবের খাব তা বুঝার জন্য প্রথম জনের উদাহরণই যথেষ্ট। শেষ পর্যন্ত আমার পক্ষথেকে যৎসামান্য দিয়ে বন্ধুকে বিদায় করলাম।

এ তো গেল প্রয়োজনাতিরিক্ত একটি বিষয়। কিন্তু বাধ্যতামূলক যে বিষয় সেটিকে এড়িয়ে যাওয়া হয় অত্যন্ত সুকৌশলে। তা হলো- পিতার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির হিস্যা থেকে মেয়েদেরকে বঞ্চিত করা। আমাদের একটি সাধারণ বদভ্যাস হচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কাজকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের উপর স্থান দেওয়া। এক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।

এখনো গ্রাম বাংলার অনেক মেয়ে বাপের সম্পত্তির ভাগ নেয়াকে ভাইদের সাথে সম্পর্ক নষ্টের কারণ মনে করে। এবং ধরে নেয়, তাদের না নেয়া সেই সম্পতির কারণেই ভাইয়ের বাড়ীতে নাইয়র যাওয়া, ভাইয়ের পক্ষ থেকে পরবী পাঠানো ইত্যাদি চলবে। আরো মনে করে, কোনদিন স্বামীর তাড়া খেয়ে ভাইয়ের বাড়ীতে আশ্রয় পাবে না, যদি সম্পত্তির ভাগ নিয়ে যায়। সুচতুর ভাইদের পক্ষ থেকে এমন সব কথা সুকৌশলে বোনদের কানে দেয়া হয়।

আমার আরেক বন্ধু, ওরা দুই ভাই চার বোন। বাবা হাজী সাহেব সরকারী চাকুরী করতেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর দুইতলা বাড়ীটি দুই ছেলেকে সমান ভাগ করে দিয়ে গেছেন। মেয়েদেরকে সরাসরি বঞ্চিত করেছেন। মজার বিষয় হলো আমার এই বন্ধু বর্তমানে ইসলামী পরিবারিক আইন তথা পিতা মাতার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের দ্বিগুন সম্পদ পাওয়ার ঘোর বিরোধী, সমান অধিকার আন্দোলনের সমর্থক। আমি বলি, তুই যা বিশ্বাস করিস প্রথমে নিজেকে দিয়ে তা চালু কর, বোনদের অংশ ভাগ করে দিয়ে দে। সে বলে তা কি করে হয়? বাবার ভুলের মাসুল আমি দেব কেন? তাদের এই মা'রেফাতি হিসাব নিকাশ বুঝা বড় মুশকিল।

আমার নিজের কথাই বলি, আমার বাবা তাঁর উত্তরাধীকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি আমার ফুফুকে দেয়ার ব্যাপারে কেমন যেন গড়িমসি ভাব দেখাচ্ছেন। আমি বুঝার চেষ্টা করে যা পেলাম তা হলো- তিনি ভাবছেন, যে জমি আছে তা থেকে বোনকে কিছু অংশ দেওয়া হলে তাঁর ছেলেদের জন্য ভাল একটা অবস্থা থাকবে না। নিজের ছেলেদের ভাল অবস্থা বিবেচনা করতে গিয়ে নিজের মেয়েদেরকে মোটেই আমলে আনতে চাচ্ছেননা তিনি। আমি বাবাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলাম, দয়া করে যার যার হক্ব তাকে দিয়ে নিজে দায়মুক্ত থাকুন। আপনার ছেলেরা সময়মত নিজ নিজ অবস্থান তৈরী করে নেবে একদিন। আপিনিও আরেকজনের সম্পত্তির ব্যাপারে জবাবদিহিতার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাবেন। এর পর থেকে তিনি নতুন করে প্লান করছেন তা লক্ষ্য করছি।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কারণে পিতা মাতার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের দ্বিগুন অংশ নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহর এই বিধান বিভিন্নভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। আল্লাহর বিধান পরিপূর্ণরূপে মান্যকরা হলে মেয়েরা কোন অবস্থাতেই ঠকতেন না। এজন্য দেশের প্রতিটি নারী আওয়াজ তুলতে পারেন তাদের আল্লাহ নির্ধারিত সম্পদের অংশ নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু তা না করে তথাকথিত নারীবাদীরা আল্লাহর আইনকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তা রদ করার অন্দোলন করে যাচ্ছেন। মজার বিষয় হচ্ছে- মুসলমান নারিদের জন্য আল্লাহর নির্ধারিত আইনের বিরোধিতায় তারও আছেন যাদেররকে তাদের ধর্মে কোন সম্পদই দেয়নি না পিতার নিকট থেকে না স্বামীর নিকট থেকে। তারা তাদের ধর্ম সংশোধনের চেষ্টা বাদ দিয়ে মুসলমানদের আইন নিয়ে তামাশা করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন।

বর্তমান মুসলীম পারিবারিক আইনে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের কম অংশ থাকার পরও তা উদ্ধারের জন্য হাই কোর্ট, সুপ্রীম কোর্ট, ইউনিয়ন কাউন্সিল ও সামাজিক সালিশ-বিচারে অসংখ্য মামলা মোকদ্দমা চলছে। সেক্ষেত্রে ছেলে আর মেয়ের সম্পত্তির অংশ সমান সমান করে আইন করলে এই জটিলতা আরো বহুগুন বেড়ে যাবে নিঃসন্দেহে।

অতএব প্রত্যেক মুসলীম বাবা এবং ভাইদের উচিৎ মেয়ে/বোনের বাড়ীতে অপ্রয়োজনীয় উপঢৌকন পাঠানোর চেয়ে তাদের প্রাপ্য সম্পদের সঠিক অংশ তাদেরকে প্রদান করা। আল্লাহ নির্ধারিত এই দায়িত্ব সঠিক রূপে পালন করা হলে দুনিয়া এবং আখেরাতে সাফল্য অবধারিত।

( লেখাটা সামহোয়ার ব্লগ থেকে নেওয়া ) ...

মন্তব্যসমূহ

Popular Post

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতাসমূহ

রাঙ্গামাটি ভ্রমণ গাইড ( Rangamati vromon guide )

কাপ্তাই ভ্রমন ( Kaptai )

অবচেতন মন এবং আবেগ

মানসিক,স্নায়বিক,মাথাব্যাথা,মৃগিরোগ,মাদকাশক্তি ইত্যাদিতে ভোগান্তি? তাহলে পড়ুন এই পোস্ট।

জ্বিন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন (জ্বিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস) বইটি পড়ুন

পলওয়েল পার্ক ( Polwel Park )

১০০ বছর আগে ঢাকার কিছু দুর্লভ ছবি (Some rare pictures of Dhaka 100 years ago)

চন্দ্রনাথ পাহাড় ( Chandranath Hill )