পোখরা ( Pokhra ) ভ্রমন (নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর )
নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর পোখরা (Pokhara) যা কাঠমুণ্ড উপত্যকার পশ্চিমে এবং নেপালের কেন্দ্রে অবস্থিত। সাত হ্রদের শহর নামে পরিচিত পোখরা শহর পর্যটকদের পছন্দের একটি শহর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে সাথে এই শহর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও সমৃদ্ধ। পৃথিবীর মধ্যে যেন এক টুকরো স্বর্গ এই পোখরা শহর। আর তাই তো প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক দূর দূরান্ত থেকে নেপাল (Nepal) এর এই শহরে ঘুরতে আসে।
পোখরার দর্শনীয় স্থান -
পোখরা শহরে দেখার মতো অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এখানকার সুন্দর স্বচ্ছ লেক মনকে যেমন শান্ত করে তেমনি দিগন্ত জোড়া পাহাড়ের দৃশ্য মনকে উদার করে তুলে। আবার এখানকার মনোরম পরিবেশ দেখার সাথে পর্যটকরা নৌকায় ঘুরে বেড়াতেও বেশ পছন্দ করে। পোখরার দর্শনীয় স্থান গুলো নিচে তুলে ধরা হল-
ফেওয়া লেক (Phewa
Lake) : নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম
এই লেকে প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটে। বিভিন্ন ধরনের জল খেলায় মেতে উঠার সাথে সাথে
ওয়াটার রাইডের মজা পাবেন এখানে। যেমন- ক্যানোইং, নৌকা চালানো, সাঁতার কাটা, সেইলিং, মাছ ধরা ও কায়াকিং। এছাড়াও এখানে দেখতে
পারবেন বিভিন্ন পাখির সমারোহ। এই লেকের মাঝে “বারাহি” নামের একটি
মন্দির আছে যেখানে প্রতি শনিবার বারাহাকে উৎসর্গ করে তার ভক্তরা পশু-পাখি বলি
দেয়। আর সার্কভুক্ত দেশ হওয়াতে এখানে বাংলাদেশিদের জন্য টিকিটের দামও কম রাখা
হয়।
ডেভিস ফল (Davis Fall) : পোখারা বিমানবন্দর থেকে মাত্র ২কিলো দূরে এই অদ্ভুত সুন্দর ঝর্ণা। মূলত ফেওয়া লেকের পানি এই ঝর্ণার মূল উৎস। এখানে “ডাভি” নামের এক মহিলার পানিতে ডুবে মৃত্যু ঘটে আর তার নামানুসারেই এই ঝর্ণার নামকরন করা হয়। এই ঘটনার কারনে পর্যটকরা এখানে এক রহস্যের সন্ধানে আসতে পছন্দ করে। তবে বর্ষাকালে এই ঝর্ণা বেশী সুন্দর লাগে ।
গুপ্তেশ্বর মহাদেব গুহা (Gupteshwar Magadev Cave) : ডেভিস ফলের পাশেই এই গুহার অবস্থান। বাঁকানো একটি সিঁড়ি দিয়ে এই গুহার ভিতরে যেতে হয়। প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠা এই গুহাকে “শিবা লিঙ্গামের” পুরানো ঘর মনে করা হয়। এক ধরনের এ্যাডভেঞ্চারের সম্মুখীন হতে হয় এখানে গেলে।
জাংছুব ছোলিং গুম্পা (Jangchub Choeling Gomba) : এই মঠটি পোখরার তিব্বতিয়ান শরণার্থীদের আবাসস্থল। এখানকার মনাস্ট্রি মূলত তিব্বতিয়ান ধাঁচে বানানো যাপর্যটকদের নজর কাড়ে। মনাস্ট্রির ভিতরের হল প্রার্থনার জন্য ব্যবহার করা হয় যার নির্মাণ শিল্প অদ্ভুত সুন্দর। আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল এখানকার ৭ ফুট লম্বা কপার ও সোনা দিয়ে মোড়ানো বুদ্ধ মূর্তি যা সবার বিশেষ আকর্ষণ।
শরনকোট (Saraonkot) : নেপালের জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পট গুলোর মধ্যে অন্যতম এই শরনকোট। এখান থেকে পোখরা ভ্যালি, অন্নপূর্ণা পর্বত ও ফেওয়া লেকের মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে। আর এখান থেকে সকালের সূর্যোদয়ের অসাধারন দৃশ্য যে কারো ভালো লাগার মতো। এখানকার পারাগ্লাইডিং এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে পর্যটকদের পোখরা ভ্রমণের ক্ষেত্রে।
পোখারা শান্তি স্তুপা (Pokhara Shanti Stupa) : বিশ্বের শান্তি প্যাগোডা নামে পরিচিত এই প্যাগোডা ফেওয়া তাইয়ের উপর অবস্থিত। এই সাদা রঙের গম্বুজ মূলত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের শান্তির প্রতীক। এই স্তুপায় পৌছানোর জন্য অনেক গুলো রাস্তা আছে যেমন- হাইকিং বা নৌকায় চড়ে আবার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হেঁটেও স্তুপায় যাওয়া যায়। গৌতম বৌদ্ধের জীবনের কিছু মূল্যবান অংশ এখানে চারটি বুদ্ধ মূর্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল মাউন্টেন মিউজিয়াম (International Mountain Museum) : পোখরার জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এখান থেকে তিনটি পর্বতশৃঙ্গ- ধওলাগিরি, অন্নপূর্ণা ও মানাসুল দেখা যায়। এখানকার নান্দনিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেকাউকে এক নির্মল আনন্দ দেয়। এই মিউজিয়ামে পাহাড় পর্বতের ইতিহাস জানার সাথে সাথে বিভিন্ন ডকুমেন্টারি দেখার মাধ্যমে পাহাড়ের ভৌগলিক অবস্থান, পর্বতে আরোহণের নিয়ম নীতি ও সারা বিশ্বের নানা তথ্য সহ পর্বতের আরও অনেক কিছুর ব্যাপারে গভীর ভাবে জানা যাবে।
গুরখা মেমোরিয়াল মিউজিয়াম (Gurkha Memorial Museum) : গুরখা মিউজিয়াম পোখরার অন্যান্য মিউজিয়াম গুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সাথে সাথে শান্তি রক্ষা মিশনে সাহসী গুরখাদের (নেপালিদের জাতীয় সৈনিক) বিভিন্ন ভূমিকা ও অর্জনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
মাহেন্দ্র গুহা (Mahendro Cave) : প্লাইস্টোসিন যুগের চুনাপাথরের এই গুহায় এক সময় মাহেন্দ্র নামের এক রাজা বাস থাকতো আর তার নামানুসারে এই গুহার নামকরন করা হয়। বোটানিক্যাল গার্ডেন দিয়ে ঘেরা এই গুহা ঘুরে ঘুরে দেখলে ইতিহাসের অনেক কিছু জানা যাবে।
অন্নপূর্ণা প্রজাপতি জাদুঘর (Annapurna Butterfly Museum) : এই ছোট জাদুঘরে ছোট ছোট অনেক প্রজাপতি দেখতে পারবেন। জাদুঘরের ভিতরের পরিবেশও পর্যটকদের ভালো লাগার মতো।
পোখরার বিশেষ আকর্ষণঃ এখানে প্যারা গ্লাইডিং, বাঞ্জি জাম্প, ক্যানোইং, আলট্রা লাইট ফ্লাইট ও পাহাড়ে ট্র্যাকিং করার মতো সুযোগ পাবেন।
নেপালের কাঠমুণ্ডু থেকে পোখরা যাওয়ার জন্য গাড়ি, বিমান বা বাস এমনকি হেলিকপ্টার সার্ভিসও আছে।বাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে নেপালের কাঠমুণ্ডুর থামেল থেকে পোখরা যাওয়ার লোকাল ও টুরিস্ট এসি বাস পাওয়া যায়। তবে ভাড়া একটু বেশী দিয়ে টুরিস্ট বাসে যাওয়াটা ভালো। বিমানের ক্ষেত্রে, কাঠমুন্ডু থেকে অভ্যন্তরীণ বুদ্ধা ও ইয়েটি বিমানে সরাসরি মাত্র আধা ঘণ্টায় পোখরা যাওয়া যায়।
প্যাকেজের মাধ্যমে পোরাখা শহর সাইটসিং করলে জনপ্রতি ৬৫০০ থেকে ৭০০০ রুপির মতো লাগবে। এর মধ্যে প্যারা গ্লাইডিংও অন্তর্ভুক্ত থাকে। আর পোখরাতে খাবারের দাম ও বেশ কম, ২০০-২৫০ রুপির মধ্যে প্রতি বেলায় সাধারন খাবার খেতে পারবেন। আর লেক সাইডে কম দামের মধ্যে কোন হোটেল এ উঠলে জনপ্রতি ৫০০-৬০০ টাকা লাগবে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিমানে যাওয়া আসা সহ পোখরাতে ৩ দিন ২ রাত থাকতে জনপ্রতি ২৫,০০০-৩০,০০০ টাকা খরচ হবে।
পোখরাতে লেক সাইডে থাকার জন্য বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল আছে। যেমন-কজি গেস্ট রুম, গৌরি শঙ্কর হোস্টেল, ওয়ও সিরিজের বিভিন্ন হোটেল, হোটেল ফেওয়া ড্রিম, হোটেল ইগল জোন, হোটেল এঞ্জেল, হোটেল ব্লু ম্যাগনেট, হোটেল ভিউ রিসোর্ট এর মতো হোটেলগুলোতে৮৫০-১৫০০ টাকার মধ্যে এসি ও ওয়াইফাই সহ দুই জনের জন্য ভালো রুম পেয়ে যাবেন।
ডাল ভাত নেপালীদের ঐতিহ্য বাহী খাবার। তবে ভোজনরসিকদের জন্য কম খরচে এখানে রয়েছে নানা খাবারের আয়োজন আর প্রায় সব খাবারই বেশ মজার। বিশেষ করে এখানকার ডাল, মোমো, স্প্যাগোটি, ফ্রাইড ট্রাউট ফিস, পাস্তা, নেওয়ারি কুজিন খেতে বেশ ভালো লাগে। আর স্ট্রীট ফুডের মধ্যে সেল রুটি,পানি পুরি, সমুচা বেশ মজার। আর প্রায় সব হোটেলেই খাবারের আগে পাঁপড় ও ঝাল চাটনি খেতে দেওয়া হয় যেটা আমরা চাইলে স্টার্টার ও বলতে পারি। আর নেপালিনাদের স্থানীয় খাবার খেতে চাইলে নারসাং কিচেন, পোখারা থাকালি কিচেন, এশিয়ান টি হাউজ, মাইকস ব্রেকফাস্ট, পোখরা বীচ ক্লাব, পেমা তিবেতিয়ান রেস্টুরেন্টে যেতে পারেন। আবার পোখরা শহরের লেক সাইডে অনেক রেস্টুরেন্টেআছে যেখানে দুপুরের বা রাতের খাবারের পাশাপাশি রাতে বার বি কিউ এরও ব্যবস্থাকরা হয়। পোখারাতে কেএফসি ও পিৎজা হাটের মতো চেইন শপ ও খুঁজে পাবেন।
কোথায় ও কি কিনবেন
মূলত পোখারাতে হ্যান্ডমেড আইটেম বেশী পাওয়া যায়। পোখরা শহরের মধ্যে ওল্ড টাউনে যেতে পারেন টুকটাক কেনাকাটা করার জন্য। এছাড়াও ফেওয়া লেকের উত্তরপূর্বের বাণিজ্যিক এলাকা শপিং এর জন্য ভালো। আবার শহরের মধ্যে টাসইলিং হ্যান্ডি ক্র্যাফটস সেন্টার (এখানে নেপালিদের হাতে বানানো বিভিন্ন জুয়েলারি ও সুভেনিয়র কিনতে পারা যায়), আর কে শপিং কমপ্লেক্স ( এখানে কম দামে নানা ধরনের হ্যান্ডি ক্র্যাফটস কেনা যাবে, একটু সামনে “পোখারা কটেজে” ভালো মানের পশমি শাল পাওয়া যায়), তিবেতিয়ান গিফট শপ (এখানে ছোট ছোট গিফট আইটেম ভালো পাওয়া যায়), ইয়াক উল হ্যান্ডি ক্র্যাফটস (এখানে উলের তৈরি নানা ধরনের পশমি কাপড়, ব্যাগ, সোয়েটার, পুতুল এবং অনেক ধরনের গিফট আইটেম পাওয়া যায়)। আর ট্রেকিং এর জিনিসপত্র কেনার জন্য যেতে পারেন আলপিনে ট্র্যাকিং ইকুইপমেন্ট বা ফেয়ার মাউন্ট ট্র্যাকিং শপে।
পোখরাতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু টিপস -
১. মার্চ থেকে এপ্রিল এবং অগাস্ট থেকে নভেম্বর এই ছয় মাসের যে কোনো সময় ঘুরে আসতে পারেন নেপালের পোখরা থেকে।
২. এখানে কেনাকাটা ও ঘোরার সুবিধার্থে টুকটাক হিন্দি জানা থাকলে ভালো।
৩. নেপালে ইন্ডিয়ান ও নেপালি রুপি দুটোই চলে। তবে কিছু নেপালি রুপি সাথে রাখা ভালো।
৪. বাসে
কাঠমুন্ডু থেকে পোখরা যাওয়ার ক্ষেত্রে রিভার সাইডের সীট নিলে আসে পাশের সুন্দর
ভিউ দেখতে পারবেন।
৫. পোখরাতে
ট্র্যাকিং করতে চাইলে হাতে ২-৩দিন সময় নিয়ে ট্র্যাকিং করতে পারলে ভালো লাগবে।
৬. এখানে
মোটরবাইকে সাইটসিং এর সুযোগ আছে, সময় থাকলে সেটা
মিস করবেন না।
৭. পোখরা সাইটসিং
করার জন্য ইচ্ছে হলে বিভিন্ন ট্যুর এজেন্সি বা হোটেলের রিসিপশনে কথা বলে প্যাকেজ
বেছে নিতে পারেন।
৮. গ্রুপে গেলে
কয়েকজন শেয়ারে ট্যাক্সি ভাড়া করে বা টুরিস্ট বাসে করেও বিভিন্ন পর্যটন স্থান
ঘুরে দেখতে পারেন তাতে যাতায়াত খরচ অনেক কম হবে।
৯. হোটেলে উঠার
ক্ষেত্রে টপ ফ্লোরে রুম নিতে চেষ্টা করবেন তাহলে সকাল ও রাতের পোখরা শহরের
সৌন্দর্য দেখতে পারবেন।
১০. বাঙ্গালি
মুসলিমদের খাওয়ার মতো প্রায় সব খাবারই পাওয়া যায় এখানে। তবে বড় হোটেল ছাড়া
ছোট হোটেল গুলোতে গরুর গোশত খুব একটা পাওয়া যায় না।
আপনার ভ্রমন নিরাপদ এবং আনন্দময় হোক।










দারুন।
উত্তরমুছুন