পোখরা, পৃথিবীর বুকে একটুকরো স্বর্গ
পোখরা ভ্রমণ
পোখরা কাঠমান্ডু শহর থেকে ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত, পোখারা শহর প্রতিটি ভ্রমণকারীর কাছে যেন পৃথিবীর বুকে একটুকরো স্বর্গ। সবুজ বন, মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং শান্ত হ্রদে ঘেরা নয়নাভিরাম পোখারা নেপালের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। প্রতিবছর প্রকৃতির টানে আচ্ছন্ন হয়ে নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে হাজারও দেশী-বিদেশী পর্যটকদের ভিড় জমে এই শহরে। আমার ব্লগের পাঠকদের উদ্দেশ্যে পোখরা দর্শনের ৭টি জনপ্রিয় স্থানকে তুলে ধরা হলো :
বেগনাস হ্রদ
সাত হ্রদের শহর পোখরার অন্যতম জনপ্রিয় স্থান বেগনাস হ্রদ। নেপালের তৃতীয় বৃহত্তম এবং পোখারার দ্বিতীয় বৃহত্তম হ্রদ এটি। এই মিঠা পানির এই হ্রদটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। যার অন্যতম কারণ এতে রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়া অসংখ্য রিসোর্ট। পানি সেচ এবং কিছু অংশে মৎসপালনের কাজে ব্যবহৃত হয় এই হ্রদটি।
১৯৮৮ সালে নির্মিত বাঁধটিতে হ্রদের পানি নিয়ন্ত্রিত হয় যা খুডি খোলা নামে পরিচিত। হ্রদটির পরিবেশ এবং আশেপাশের রিসোর্টগুলো আপনার সত্তাকে দিবে প্রশান্তি। পোখরা বিমানবন্দরটি বেগনাস হ্রদটির দূরত্ব প্রায় ৭ দশমিক ৫ মাইল। সেখান থেকে দুই মাইল পেরোলেই বেগনাস মার্কেট পেয়ে যাবেন। আরও একটু এগুলোই দেখতে পাবেন সুন্দর পর্বতমালার দৃশ্য, নাম বেগাসকোট।
ডেভিস জলপ্রপাত
বিমানবন্দর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে ডেভিস জলপ্রপাত। জলপ্রপাতটির নামকরণের পেছনে লুকিয়ে আছে এক মর্মান্তিক ঘটনা। ১৯৬১ সালে সুইস এক নারী জলপ্রপাতটিতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন। এরপরেই তার নামে জলপ্রপাতটির নামকরণ হয়, ডেভিস জলপ্রপাত। জলপ্রপাতের পানি কোনও নদী বা জলাশয়ে পড়ে না, বরং আশপাশের গুহাগুলোর গর্তে দিয়ে ঠিক কোথায় গিয়ে পরে তার হদিস আজ পর্যন্ত কেউ পায়নি।
রহস্যময় এই ঘটনাটি দেখতে তাই পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে এখানে। যা এটিকে পোখরার সর্বাধিক জনপ্রিয় স্থান হিসাবে তৈরি করেছে। ঠিক পাশেই রয়েছে দেবী মনকামনা ভগবতীন্দের মন্দির। ভক্তদের ধারণা এই মন্দিরটিতে কয়েন ফেলে আপনি যে মনকামনা করবেন, সেটাই নাকি ফলে যাবে।
সারংকোট
শহরের কোলাহল থেকে দূরে পোখরার উপকণ্ঠে অবস্থিত সারংকোট, একটি ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। গ্রামটিতে পাবেন নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ। সারংকোটে অনেক পাখির প্রজাতি বাস, তবে ভাগ্য প্রসন্ন থাকলে দেখা মিলতে হাতি, বাঘ বা চিতাবাঘের মতো বন্যপ্রাণীদের।গ্রাম্য পরিবেশে অন্নপূর্ণা পর্বতশ্রেণীর দর্শনের জন্য পর্যটকদের আনাগোণা লেগেই থাকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সারাংকোট প্যারাগ্লাইডিং-এর জন্যেও জনপ্রিয় এক জায়গা।
প্রথম ফ্লাইট শুরু হয় সকাল সাড়ে ৯টায় এবং দ্বিতীয় ফ্লাইট সাড়ে ১১টায়। আপনি যদি পেহয়া তাল এর ওপর দিয়ে যেতে চান তবে সকালের ফ্লাইটে যাওয়াই উত্তম। প্যারাগ্লাইডিং ছাড়াও আরও কিছু রোমাঞ্চকর খেলার সুযোগ এখানে পাওয়া যায়। সারাংকোট বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত এবং দীর্ঘ জিপলাইন এর প্রারম্ভিক বিন্দু। পাহাড়ের শুরু থেকে যাত্রার শুরু আর শেষ হয় নিচের উপত্যকায়। এছাড়া ট্রেকিং ভালোবাসলে সে ব্যবস্থাও আছে এতে। আপনি চাইলে অন্নপূর্ণা ট্রেকিং-এর কিছুটা চ্যালেঞ্জিং পথ এখানে এবং পোখরার আশেপাশের গ্রামের মধ্য দিয়ে বেছে নিতে পারেন।
ফেওয়া লেক
এটি নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক লেকের একটি। লেকের মাঝে একটি মন্দির আছে, নাম 'বারাহি হিন্দু মন্দির '। ফেওয়া বা ফিউয়া লেকে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো নৌকা ভ্রমণ। ফেওয়া লেকে নৌকায় ভ্রমণ শুরু করতে হবে দিনের শুরুতেই। এখানে নৌকার ভাড়া নির্ধারিত করে দেয়া। তাই দামাদামির কিছু নাই। ছোট এবং বড় দুই ধরনের নৌকা আছে। ৯-১০ জন যেতে পারবে বড় নৌকাতে। লেকের পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। হঠাৎ করে দেখলে মনে হতে পারে আপনি ইউরোপের কোন লেকে বসে আছেন। ভাড়া নৌকায় মন্দিরের দিকে যাত্রা করতে পারেন কিংবা লেকের চারপাশে ঘুরে দেখতে পারেন।
পোখরা শান্তি স্তূপ
আন্দু পর্বতের উপর তৈরি বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের জন্য স্তূপটির স্থানীয় নাম শান্তি স্তূপ, আরেকনাম 'পিস প্যাগোডা'। সাধনার জন্য প্রসিদ্ধ এই স্থান। বলা হয়, বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ মন্দিরটিকে শান্তির প্রতীক হিসাবে তৈরি করেছিলেন। পাহাড়ের শীর্ষে তৈরি এই স্থাপনা যে কারও কাছেই ভালো লাগবে। স্তূপটিতে পৌঁছনোর জন্য তিনটি ভিন্ন উপায় রয়েছে; নৌকা দিয়ে, একটি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে অথবা বাঁধের উপর দিয়ে হেঁটে, তবে সবচেয়ে নিরাপদ এবং জনপ্রিয় উপায় হচ্ছে নৌকা ভ্রমণ। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছার পর হিমালয় এবং পোখারা উপত্যকার এক চমকপ্রদ দৃশ্য আপনাকে স্বাগত জানাবে।
পর্যটক এবং ধর্মীয় লোকদের জন্য স্তূপের দুটি স্তর রয়েছে। দ্বিতীয় স্তরে, বুদ্ধের চারটি মূর্তি প্রদর্শিত হয়েছে, যার প্রত্যেকে অন্য দেশ থেকে এসেছে-জাপানের 'ধর্মচক্র মুদ্রা', শ্রীলঙ্কার 'বোধগয়া', থাইল্যান্ডের 'কুশিনগর' এবং নেপাল থেকে 'লুম্বিনী'। মূর্তিগুলো বুদ্ধের জীবনীর আদলে গড়া। 'ধর্মচক্র মুদ্রা' বুদ্ধের জীবন, ধর্ম এবং বুদ্ধের শিক্ষার চাকা নির্দেশ করে এবং 'বোধগয়া' করে বুদ্ধি ও করুণার প্রতীক। ভগবান বুদ্ধের মূর্তির বাসস্থান স্তূপের পাশেই একটি মন্দিরে। আপনি যদি মন্দির স্থাপত্য নিয়ে অধ্যয়ন করতে চান এবং নিজেকে বৌদ্ধ শিক্ষা এবং ধর্মগ্রন্থগুলোর সাথে অন্তর্নিহিত করতে চান, তবে পোখরা শান্তি স্তূপ দর্শন আবশ্যক।
গুপ্তেশ্বর মহাদেব গুহা
ডেভিস ফলসের বিপরীতে, একটি সর্পিল সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই দেখা মিলবে গুপ্তেশ্বর মহাদেব গুহার প্রবেশ পথ। গুহাটি বেশ প্রাচীন। ভেতরে আছে শিবলিঙ্গম, যেটি নাকি হাজারবছর আগে গুহা খোদাই করতে পাওয়া গিয়েছিলেন। রয়েছেন একজন পুরোহিত যিনি হিন্দু শাস্ত্রমতে প্রতিদিন শিবপূজা করেন। তাই এটি একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ও বটে। গুহার প্রবেশদ্বারে স্যুভেনির স্টলের পসার এবং আছে একটি টিকিট কাউন্টার। ভেতরে কোন আলো প্রবেশশ না করায় গুহায় ঢুকেই দরকার পড়বে টর্চলাইটের।
প্রবেশদ্বার থেকে প্রায় ৪০ মিটার হাঁটলে তবেই মিলবে শিব লিঙ্গমের দর্শন। ততক্ষণে ভয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত না হলে পূজার স্থান পেরিয়ে যেতে পারেন গুহার দ্বিতীয় অংশের দিকে। যার নাম 'চামেরি গুহা'। এর ভেতরে প্রচুর বাদুরও আছে। পাথরের গঠন এবং শেওলার কারণে পথটি একটু বিপদজ্জনক। একদম শেষদিকে, আপনি ডেভিস ফলস পতনের অদৃশ্য জলের রহস্য উন্মোচন করতে পারবেন। ভাষায় যার সৌন্দর্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। দৃশ্যটি উপভোগ করতে হলে তাই দেখতে হবে স্বচক্ষে।
আন্তর্জাতিক পর্বত জাদুঘর
এটি পোখরা শহরের কেন্দ্রস্থলে, বিমানবন্দর থেকে ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। এখান থেকে তিনটি পর্বতশৃঙ্গ দেখতে পাওয়া যায়। যার নাম, ধৌলগিরি, অন্নপূর্ণা ও মানাসলু। প্রতি বছর হাজার হাজার স্থানীয় পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটক এই জাদুঘরটি দেখতে আসেন। যেখানে পর্বত এবং পর্বতারোহণ সম্পর্কিত বিভিন্ন নথি ও অন্যান্য জিনিস রয়েছে।
তিনটি প্রদর্শনী হল রয়েছে : হল অব ফেম, হল অব গ্রেট হিমালয় এবং হল অব ওয়ার্ল্ড মাউন্টেইনস। পর্বতারোহীর পোশাক, জীবনযাত্রা, বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখর, বিখ্যাত পর্বতারোহীর বিবরণ এবং নেপালিদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা জাদুঘরটির মূল উদ্দেশ্য।
হাতে সময় থাকলে কষ্ট করে ভিজিট করে আসতে পারেন আমার অন্য ব্লগ থেকে








মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন