তিন্দু ( Tindu ) , বাংলার ভূ-স্বর্গ

মেঘের মধ্য দিয়ে নৌকা নিয়ে ভেসে যাওয়ার দৃশ্য কল্পনা করলে তা কেবল স্বপ্নই মনে হয়। কিন্তু বাস্তবেই এই স্বর্গীয় সৌন্দর্য আপনার চোখে ধরা দেবে বাংলাদেশেই। শুনতে অসম্ভব মনে হলেও এই অপার্থিব  অভিজ্ঞতা আপনি পাবেন তিন্দু ভ্রমণে। তিন্দুকে বলা হয় বাংলার ভূ-স্বর্গ। তিন্দুতে গেলে আপনার মনে হবে পৃথিবীতে এমন ঘুম-ঘুম সুন্দর জায়গা আর একটিও নেই। তিন্দু বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। এডভেঞ্চার প্রেমী পর্যটকদের কাছে অঞ্চলটি তার ভিন্ন মাত্রিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে বেশ পরিচিত। আর তাই আপনি যদি এডভেঞ্চার প্রিয় হয়ে থাকেন তাহলে দেশের ভিতরেই এই অনবদ্য এডভেঞ্চার এর সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করবেন না।

তিন্দুর অপার সৌন্দর্যের বর্ণনা আসলে লিখে প্রকাশ করার মত না। আকাশ, কুয়াশা, মেঘ, নদী, পাথর, পাহাড়, ঝর্ণা, বন, নীল-সবুজ পানি ,পাহাড়িদের জীবন আর রহস্য-রোমাঞ্চ-ভয় সবকিছুর এক অসাধারণ মেলবন্ধন এই তিন্দু। মেঘ-কুয়াশার দেশ তিন্দুর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এখানে বর্ষাকালে নৌকায় চড়ে মেঘের ওপরে যাওয়া যায়। সাদাটে মেঘের ভিতর দিয়ে কিছুক্ষণ চললেই দেখবেন আপনার মাথা ভিজে গেছে। মেঘের ভিতর নৌকা নিয়ে ভেসে চলার অনুভূতি স্বর্গীয়, মেঘের এই সিক্ততা আপনার শরীর ও মন দুটোই ভিজিয়ে দেবে। সকালে ঘরের ভেতরে ফুঁ দিয়ে মেঘ সরিয়ে যখন দরজা খুঁজে বের করতে হয় তখন নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হবে আপনার এই দেশে জন্মানোর জন্য।
এখানে শক্ত কঠিন পাথরগুলো বুকে নিয়ে বয়ে চলে স্বচ্ছ পানির ঢল। নুড়ি পাথরে হাঁটতে হাঁটতে ইচ্ছে করে টুপ দিয়ে ডুব দিয়ে শরীর ভিজিয়ে নেই কিছুক্ষণ এই টলটলে পানিতে। তিন্দুর দুই পাশ দিয়ে চলে গেছে দুটো ঝিরিপথ, সারাদিন সেখান থেকে কলকল করে ছুটে আসছে পাহাড়গলা স্বচ্ছ পানি। পানি আর পাথর মিলে এখানে যে নকশিকাঁথা তৈরি করেছে তার সৌন্দর্য আপনাকে সম্মোহিত করে রাখবে। তিন্দু পাড়ের পাথুরে সৈকত এখানে যোগ করেছে নতুন একটা মাত্রা।
তিন্দুকে ফেলে আরো ওপরের দিকে যখন এগোতে থাকবেন তখন মনে হবে মিনিটে মিনিটে বদলে যাচ্ছে পানির নিচের পাথুরে জগতটা। ছোট ছোট পাথর যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠতে থাকল। জায়গাটির নাম ‘বড় পাথর’। তিন্দুর এই বড় পাথর আর বাঘিসং এর সৌন্দর্য আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করবে। এখানে শুধু পাথর আর পাথর। নানা আকৃতির পাথরের ফাঁক গলে এগিয়ে চলে নৌকা। এখানে দুই পাশে পাহাড় উঁচু হয়ে যেন দিগন্ত ছুঁয়েছে। পাহাড়ের গায়ে জন্মানো গাছগুলো দেখে বিমুগ্ধ হবেন। আর পায়ের নিচে পাথুরে সাদা বালি চিক চিক করছে। এখানে পাথর আর পানি মিলে ভরদুপুরে তৈরি করে রংধনু। উত্তরের হাওয়ায় ভাসতে থাকা সেই রংধনু লুকোচুরি খেলে নদীর পাড়জুড়ে ঝুলতে থাকা গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে। এই মেঘের রাজ্যে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের অপার সৌন্দর্য দেখতে হয় ফুঁ দিয়ে মেঘ সরিয়ে। এ এক অন্য সৌন্দর্যের ভুবন। প্রকৃতি যেন এখানে সব সৌন্দর্য উজাড় করে ঢেলে দিয়েছে।

তিন্দু কিভাবে যাবেন: 

ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন বান্দরবানের উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি পরিবহন সার্ভিসের বাস ছেড়ে যায়। যেমন হানিফ, ইউনিক, শ্যামলী, এস আলম, ডলফিন ইত্যাদি যেকোনো একটি বাসে চড়ে যেতে পারেন বান্দরবান। বান্দরবান শহর থেকে চান্দের গাড়ি নিয়ে সোজা থানচির উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। এক্ষেত্রে গ্রুপে গেলে খরচ কম হবে। চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করলে খরচ পড়বে তিন থেকে চার হাজার টাকা। এছাড়া লোকাল চান্দের গাড়ি আছে, তাতে ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ১০০-১৫০ টাকা। থানচি বাজারে পৌঁছে সবার আগে যে কাজটি করবেন তা হচ্ছে বিজিবিকে আপনার পরিচয় দিয়ে তাদের নিকট থেকে অনুমতি নেয়া। বাজার থেকে আপনাকে নৌকা ভাড়া করতে হবে। ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে ২ ঘণ্টা ২০ মিনিটেই পৌঁছে যাবেন তিন্দু। নৌকা ভাড়া পড়বে দিনপ্রতি আট’শ থেকে নয়’শ টাকা।

তিন্দু কোথায় থাকবেন: 

তিন্দুতে রাতে থাকতে পারেন এখানকার ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা মেম্বারের বাসায়। আর যদি  তাঁবু নিতে পারেন তবে ক্যাম্পিং করে থাকতে পারবেন অনায়াসে। এছাড়া মারমাদের বাঁশ-কাঠের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। মারমাদের প্রতিটি বাড়িতেই খুব অল্প টাকায় থাকা-খাওয়ার সুবিধা রয়েছে। 

মন্তব্যসমূহ

Popular Post

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতাসমূহ

রাঙ্গামাটি ভ্রমণ গাইড ( Rangamati vromon guide )

কাপ্তাই ভ্রমন ( Kaptai )

অবচেতন মন এবং আবেগ

মানসিক,স্নায়বিক,মাথাব্যাথা,মৃগিরোগ,মাদকাশক্তি ইত্যাদিতে ভোগান্তি? তাহলে পড়ুন এই পোস্ট।

জ্বিন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন (জ্বিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস) বইটি পড়ুন

পলওয়েল পার্ক ( Polwel Park )

১০০ বছর আগে ঢাকার কিছু দুর্লভ ছবি (Some rare pictures of Dhaka 100 years ago)

চন্দ্রনাথ পাহাড় ( Chandranath Hill )