রঙরাং পাহাড়, রাঙামাটি

পাহাড়ের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সবুজ রুপ বৈচিত্রের শ্যামলভূমি রাঙামাটি জেলা। এর অবারিত সৌন্দর্য দেশী-বিদেশী পর্যটকদের মনে দোলা দেয় প্রতি মুহুর্তে, যার টানে পর্যটকরা আবারও ফিরে আসে প্রাকৃতিক নৈসর্গের লীলাভূমি এ জেলায়। রাঙামাটির কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্ণফুলী হ্রদ, সুবলং ঝর্ণা, কাপ্তাই লেক, ঝুলন্ত ব্রিজ, সাজেক ভ্যালী এর সৌন্দর্যে হয়ত অনেকেই মুগ্ধ হয়েছেন। তবে অপূর্ব সৌন্দর্যের রঙরাং পাহাড় চূড়ায় না উঠলে আপনার রাঙামাটি ভ্রমণই অসম্পূর্ন থেকে যাবে।
বালুখালী থেকে কাপ্তাই লেকে ঘুরাঘুরি করার ফাঁকে অপনার চোখে পড়বে অদূরের এক পাহাড়। যার থেকে আপনি নজর ফেরাতে পারবেন না। যাকে দেখে মনে এসে যেতে পারে অসংখ্য কবিতা। রঙরাং পাহাড়ের কোলঘেঁষে বয়ে গেছে মোহনীয় কর্ণফুলী। কর্ণফুলীর পাশে বরকল ও জুরাছড়ি উপজেলায় অবস্থান রঙরাং পাহাড়ের। রঙরাং পাহাড়ে উঠতে চাইলে প্রথমেই আপনাকে নৌকা নিয়ে যেতে হবে সুবলং ঘাটে। তারপর পাহাড়ে ওঠার অনুমতির জন্য আপনাকে সেনা ক্যাম্পে যেতে হবে।

সেখানে সহজেই পাহাড়ে ওঠার অনুমতি পাওয়া যায়। পাহাড়টা দেখে যদি মনে করে থাকেন খুব সহজেই ওঠা যাবে এ পাহাড় চূড়ায় তাহলে ওপরে উঠতে গিয়ে প্রথমেই হোঁচট খাবেন খানিকটা। কারণ এই পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠার পথ বেশ খাড়া। শরীরের যথেষ্ট ঘাম ঝরিয়ে তবেই আপনি পাহাড়ের চূড়ার দেখা পাবেন। ২০ থেকে ৩০ মিনিটের ট্রেকিং করেই আপনি উঠে যেতে পারবেন রঙরাং এর চূড়ায়। খাড়া এ পাহাড়ে উঠতে কষ্ট হলেও সেটি চাপা পড়ে যাবে চারপাশের অপরুপ সৌন্দর্যের হাতছানিতে। রঙরাং আনন্দে সাজিয়ে দেবে আপনার মন। রঙরাং পাহাড় চূড়াটি যেন রাঙামাটির সমস্ত সৌন্দর্যই ধারণ করে রেখেছে।

পাহাড়ের কোল ঘেঁষে দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কর্ণফুলী নদী। দুই পাহাড়ের মাঝে কর্ণফূলীর এ সৌন্দর্য না দেখলে যেন কিছুই দেখা হয়নি! পূর্ব দিকে ছোট্ট দ্বীপের ওপর মাথা জাগিয়ে নিঃশ্বাস ফেলছে সুবলং বাজার। দূরের ঢেউখেলানো পাহাড় সারি অন্যরকম শৈল্পীক রুপ ধারণ করেছে এখানে। প্রশস্ত কাপ্তাই লেকের বুকে ছোট-বড় দ্বীপপুঞ্জ। রঙরাং এর চূড়ায় না উঠলে রাঙামাটির এমন সৌন্দর্য আপনার কাছে থেকে যাবে অজানা। রাঙামাটিতে এসে কেবল কাপ্তাই লেক আর কর্ণফুলী নদীর বুকে ভ্রমণ করেই এখানকার প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় না, যতক্ষণ না আপনি রঙরাং এর চূড়ায় উঠবেন। সুবলং বাজার একটি ট্রানজিট পয়েন্ট। সকল নৌকা ও লঞ্চের ছাড়পত্র লাগে এখানকার সেনাক্যাম্পের। কাসালাং আর কর্ণফুলীর সংযোগ এলাকাও এটি।

সুবলং থেকে দক্ষিণে কাপ্তাই লেকের একটা অংশ গিয়ে মিশেছে জুরাছড়ি পর্যন্ত। আর উত্তর-পূর্বে মারিশ্যা-লংগদু হয়ে আরও বিস্তৃত এ লেকের সীমানা। পূর্ব দিক থেকে বরকলের পাহাড়সারি চিরে এসেছে কর্ণফুলীর স্রোত। আর বহতা কাসালং কাপ্তাই লেকের বিস্তীর্ণ জলরাশির সঙ্গে গড়াতে গড়াতে কর্ণফুলীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে এই সুবলং এলাকায়। চারপাশের এমন সব সৌন্দর্য চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে , যদি রঙরাং এর চূড়ায় উঠে উৎসুক দুচোখ মেলাতে পারেন। জানা যায়, রঙরাং পাখিদের নামানুসারে এই পাহাড়ের নামকরন করা হয়েছে। এই রঙরাং পাখিগুলো অনেকটা ধনেশ পাখির মত দেখতে। এক সময় নাকি সুবলং এলাকায় কর্ণফুলী নদীর পাড়ে এবং আশেপাশের পাহাড়ে রঙরাং পাখিদের বসবাস ছিল। পানি পথে মানুষের যোগাযোগ ক্রমেই বাড়ার ফলে রঙরাং পাখিরা আর নিরাপদ মনে করল না নিজেদের। আর দেখা যায় না সুবলং এলাকায় রঙরাং পাখিদের। তবে রাঙামাটির আদিবাসিদের ভাষ্য অনুযায়ী কখনো কখনো দু একটা পাখির দেখা মেলে। দেখা যাক আর না যাক, পাহাড়ের আদিবাসিরা এখনো এ পাহাড়কে রঙরাং নামেই চেনেন।

রঙরাং পাহাড়ের পাদদেশেই রয়েছে সেনাক্যাম্প। পাহাড়ের ওপরেই আছে টিএন্ডটির টাওয়ার, সেটির নিরাপত্তা বিধানের জন্য পাহাড়ের চূড়ায় আছে পুলিশের ক্যাম্প। তাই অনেকে এখন এটিকে টিএন্ডটি পাহাড় বলে থাকেন। আগেই বলে রাখি খাবার পানি সংগ্রহ করা এখানে খুবই কঠিন কাজ তাই সঙ্গে করে পানি নিতে যেন ভুলবেন না। আরও বলে রাখি নৌকার মাঝিরা সুবলং ঘুরিয়েই শেষ করতে চাইবেন তাদের কর্ম। এমনকি অনেক পর্যটক সুবলং বাজারটাও ঘুরে যেতে পারেন না নিজেদের কাছে তথ্য না থাকার কারণে। অথচ রঙরাং সুবলং ঝরনার খুব কাছাকাছি একটি পাহাড়। আপনি নৌকাতে ওঠার আগেই অবশ্যই মাঝির সঙ্গে ঠিক করে নেবেন আপনি কোথায় যেতে চান।

যেভাবে যাবেন রঙরাং পাহাড়: 
ঢাকার ফকিরাপুল মোড় ও সায়দাবাদে রাঙামাটিগামী অসংখ্য এসি ও নন-এসি বাস রয়েছে। এই বাসগুলো সাধারণত সকাল ৮ টা থেকে ৯ টা এবং রাত ৮ টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১১ টার মধ্যে রাঙামাটির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। তাদের মধ্যে রয়েছে হানিফ, শ্যামলী, এস আলম, ইউনিক, সৌদিয়া ইত্যাদি।এসব বাসে চেপে যেতে হবে রাঙামাটি শহর। এরপর আপনাকে নৌকা রিজার্ভ করতে হবে।

নৌকার ভাড়ার পড়বে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। ভাড়া ঠিক করার সময় প্যাকেজে শুভলং ঝর্ণা, শুভলং বাজার ও রঙরাং পাহাড় একসাথে অন্তর্ভুক্ত করে নিবেন।

যেখানে থাকবেন: 
রাঙামাটিতে বিভিন্ন মানের গেস্ট হাউজ ও আবাসিক হোটেল রয়েছে। রাঙামাটি শহরের পুরাতন বাসন্ট্যান্ড ও রিজার্ভ বাজার এলাকায় লেকের কাছাকাছি হোটেল ঠিক করার চেষ্টা করুন। তাহলে হোটেল থেকে কাপ্তাই লেকের পরিবেশ ও শান্ত বাতাস উপভোগ করতে পারবেন। এছাড়া কম খরচে থাকতে বোডিং এ যোগাযোগ করতে পারেন। বোডিংগুলোতে থাকতে খরচ কম হলেও এগুলোর অবস্থা খুব একটা ভাল নয়।

মন্তব্যসমূহ

Popular Post

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতাসমূহ

রাঙ্গামাটি ভ্রমণ গাইড ( Rangamati vromon guide )

কাপ্তাই ভ্রমন ( Kaptai )

অবচেতন মন এবং আবেগ

মানসিক,স্নায়বিক,মাথাব্যাথা,মৃগিরোগ,মাদকাশক্তি ইত্যাদিতে ভোগান্তি? তাহলে পড়ুন এই পোস্ট।

জ্বিন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন (জ্বিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস) বইটি পড়ুন

পলওয়েল পার্ক ( Polwel Park )

১০০ বছর আগে ঢাকার কিছু দুর্লভ ছবি (Some rare pictures of Dhaka 100 years ago)

চন্দ্রনাথ পাহাড় ( Chandranath Hill )