তাজিংডং - দূর্গম পাহাড়ের চূড়ায় স্বর্গের হাতছানি

অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যের আধার পাহাড়ীকন্যা বান্দরবান। উঁচু নিচু পথ, পাহাড়ের শরীর-জুড়ে ঘন সবুজের সমারোহ আর মেঘের লুকোচুরি খেলা বান্দরবনকে করেছে ভ্রমণ-প্রেমীদের জন্য এক স্বর্গ। বান্দরবানের পাহাড়গুলো যেমন দুর্গম তেমনি সৌন্দর্যের মায়াজালে ঘেরা। এই দুর্গম সৌন্দর্য হাতছানি দিয়ে ডাকে এ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ভ্রমণ পিপাসুদের। প্রকৃতি কন্যা বান্দরবানের পাহাড়শ্রেণী ট্রেকারদের জন্য এক আকর্ষণের নাম। এখানকার পাহাড়ি রোমাঞ্চকর দুর্গম পথ তাই সকল ট্রেকারদের টানে দুর্নিবার আকর্ষণে। এ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা তাই সুযোগ পেলেই ছুটে আসে বান্দরবানের পানে। ট্রেকার আর এ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের অন্যতম এক আকর্ষণের নাম হল তাজিংডং পর্বত। বাংলাদেশের অন্যতম একটি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং এ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের জন্য দারুণ এক গন্তব্য।
তাজিংডং বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার রেমাক্রী পাংশা ইউনিয়নে অবস্থিত। রুমা উপজেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে এই পর্বতের অবস্থান। স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছে তাজিংডং। স্থানীয় ভাষায় তাজিং অর্থ বিশাল এবং ডং অর্থ পাহাড় একত্রে যার অর্থ দাড়ায় বিশাল পাহাড়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৩০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই পাহাড় এ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকদের দারুণ পছন্দের এক গন্তব্য। এর উচ্চতা ১২৮০ মিটার। তাজিংডং ও তার আশেপাশে ছড়িয়ে আছে অবারিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এছাড়া এখানকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও জীবন বৈচিত্র্য আপনাকে মুগ্ধ করবে।

দুর্গম পথ হওয়ার কারণে বর্ষাকালে তাজিংডং এ আসা অনেক কষ্টসাধ্য। তাই বেশিরভাগ পর্যটক শুষ্ক মৌসুমে এখানে এসে থাকেন। এখানকার পাহাড়ি রাস্তাজুড়ে নাম না জানা অসংখ্য গাছ চোখে পড়বে আপনার। শীতের দিনের শেষ ভাগে পুরো পথটি কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে থাকে। পাহাড়ের কোলজুড়ে থাকে কুয়াশার বিছানা। শুষ্ক মৌসুমে অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকরা পায়ে হেঁটে তাজিংডং আসেন। রহস্যময় থানচির পাশ কাটিয়ে এই পাহাড়টি ভ্রমণ দারুণ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দেবে আপনাকে।

শীতের সময় অপরূপ সাজে সেজে ওঠে ভোরে থানচি। চারপাশে কুয়াশা। ভোরের আলোয় যাত্রাপথে শীতের দিনে পাহাড়ের সবুজ রং হারানো কুয়াশায় মোড়ানো পথ আপনার মনকে রাঙিয়ে তুলবে। উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ, পথে পথে ছোট জুম ঘর। পাহাড়ের চূড়া বেয়ে নামা সকালের নির্মল সোনালি রোদ। পথ চলতে চলতে পাহাড়ের ওপর থেকে চোখে পড়বে উপজাতীয় বোডিং পাড়া। এখানে ম্রো আদিবাসীর বসবাস। পাশেই বম আদিবাসীর বসবাস।
তাজিংডং এর চূড়া থেকে স্বর্গীয় এক দৃশ্যের দেখা পাবেন আপনি। দিগন্ত-জোড়া সবুজ পাহাড় আর পাহাড়ের বুকে তুলোর মত ভেসে বেড়ানো মেঘ আপনাকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দেবে। আর রাতে নামলে এখানে নেমে আসে আরেক অপার্থিব সৌন্দর্য। পূর্ণিমায় আপনার চোখে পড়বে পাহাড়-ঘেঁষা জোছনা। ধবধবে জোছনার আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে এই গোটা পাহাড়ি জনপদ। পাহাড়ের এই রূপ আপনার কল্পনাকেও হার মানাবে। সমস্ত আকাশ-জুড়ে হাজারও তারার দল, রূপালি জ্যোৎস্নার আভা, অরণ্য-ভূমি, ছোট-বড় ঝরনা, জুমের খেত সবমিলিয়ে এক সৌন্দর্যের মেলা বসে তাজিংডংজুড়ে।

তাজিংডং কিভাবে যাবেন ?

আপনাকে প্রথমে বান্দরবান আসতে হবে তাজিংডং যাবার জন্যে। দেশের যেকোনো জেলা থেকেই বান্দরবানের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল। ঢাকার কলাবাগান, সায়দাবাদ এবং ফকিরাপুল থেকে শ্যামলী, হানিফ, ইউনিক, এস আলম, ডলফিন ইত্যাদি পরিবহনের বাস বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এর যেকোনো একটি বাসে চড়ে সহজেই বান্দরবানের আসতে পারেন। ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান যেতে সময় লাগে ৮-১০ ঘণ্টা। এছাড়া মহানগর, তূর্ণা কিংবা চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে করে প্রথমে চট্টগ্রামে তারপর সোজা বান্দরবানে চলে যেতে পারেন।
চট্টগ্রাম শহরের বদ্দারহাট থেকেও পূবালী ও পূর্বানী পরিবহনের নন-এসি বাস ৩০ মিনিট পরপর বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এরপর বান্দরবান শহর থেকে বগালেক যেতে প্রথমে যেতে হবে রুমা বাজার। বান্দরবান থেকে রুমা বাজারের দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার। লোকাল বাস কিংবা চাঁন্দের গাড়ি/জীপে করে রুমা বাজার যাওয়া যায়। বাসে যেতে হলে বান্দরবানের রুমা বাস স্ট্যান্ডে যেতে হবে। সেখান থেকে ১ ঘণ্টা পর পর বাস রুমার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। দলগত ভাবে গেলে রুমা বাজার যেতে পারেন জীপ/চাঁন্দের গাড়িতে করে।

এক গাড়িতে ১০-১৫ জন যাওয়া যায়। বান্দরবান শহরের জীপ স্টেশন ৩০০০-৪০০০ টাকা ভাড়ায় গাড়ি নিতে হবে। জীপে করে গেলে সময় লাগবে ২ ঘণ্টার মত। রুমা বাজার পৌঁছে আপনাকে গাইড ঠিক করে নিতে হবে। রওনা হবার আগে রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে যাবার অনুমতি নিতে হবে। সেখানে নিয়ম অনুযায়ী নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার লিপিবদ্ধ করতে হবে। আর অবশ্যই মনে রাখবেন বিকেল ৪ টার পর রুমা বাজার আর্মি ক্যাম্প থেকে অনুমতি কিছুতেই মিলবেনা। রুমা উপজেলা সদর থেকে পায়ে হেঁটে বগালেক হয়ে কেওক্রাডং এর পাশ দিয়ে আপনাকে তাজিংডং যেতে হবে।

তাজিংডং কোথায় থাকবেন ?

রুমা উপজেলা সদরে রাত যাপনের জন্য বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে। চাইলে এগুলোতে থাকতে পারেন। এছাড়া বান্দরবানে পর্যটকদের থাকার জন্য বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং গেস্ট-হাউস রয়েছে। এগুলোতে ৬০০ থেকে ৩০০০ টাকায় থাকতে পারবেন। এ ছাড়া পর্যটকদের থাকার জন্য অনেক আকর্ষণীয় কটেজের ব্যবস্থা রয়েছে।

মন্তব্যসমূহ

Popular Post

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতাসমূহ

রাঙ্গামাটি ভ্রমণ গাইড ( Rangamati vromon guide )

কাপ্তাই ভ্রমন ( Kaptai )

অবচেতন মন এবং আবেগ

মানসিক,স্নায়বিক,মাথাব্যাথা,মৃগিরোগ,মাদকাশক্তি ইত্যাদিতে ভোগান্তি? তাহলে পড়ুন এই পোস্ট।

জ্বিন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন (জ্বিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস) বইটি পড়ুন

পলওয়েল পার্ক ( Polwel Park )

১০০ বছর আগে ঢাকার কিছু দুর্লভ ছবি (Some rare pictures of Dhaka 100 years ago)

চন্দ্রনাথ পাহাড় ( Chandranath Hill )