হাজারিখিল অভয়ারণ্য, চট্টগ্রাম
পার্বত্য জেলা চট্টগ্রামের সৌন্দর্যের যেন কোনো শেষ নেই। পাহাড়, হ্রদ, সবুজ বনানী ঘেরা এই জেলাটির অনবদ্য সুন্দর জায়গাগুলো মায়ায় বেঁধে রাখে ভ্রমণ পিপাসুদের। আর তাই তারা সুযোগ পেলেই ছুটে যায় চট্টগ্রামের রূপে মুগ্ধ হতে। রোমাঞ্চকর ভ্রমণ আনন্দেও চট্টগ্রামের জুড়ি নেই। বুনো সৌন্দর্য আর রোমাঞ্চের অন্যরকম স্বাদ নিতে ঘুরে আসতে পারেন চট্টগ্রামের হাজারিখিল অভয়ারণ্য থেকে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় রামগড়-সীতাকুণ্ড বনাঞ্চলে প্রায় ৩ হাজার একর জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে হাজারিখিল অভয়ারণ্য। অনায়াসেই আপনার চোখ জুড়াবে অনাবিল বুনো সৌন্দর্যে। ২০১৪ সালে এই হাজারিখিল বনাঞ্চলকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এখানে প্রায় ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১২৩ প্রজাতির পাখি, আট প্রজাতির উভচর, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও বিলুপ্ত প্রজাতিসহ ২৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। হাজারিখিল অভয়ারণ্যে রয়েছে হরিণ, হনুমান, বানর, খরগোশ, সজারু, বনছাগল, বনরুই, বনশূকর, বনবিড়াল, শিয়াল, উদবিড়াল, গোরখোদক, ময়না, টিয়া, ঘুঘু, মাছরাঙা, সাদা বক, চড়–ই, ডাহুক, কাক, দোয়েল, বুলবুলি ইত্যাদির বিচরণ। এছাড়া এ অভয়ারণ্যে রয়েছে বনকুকুর, বনমুরগি, তক্ষক, গিরগিটি, মুখপোড়া হনুমান, বানর, গুইসাপ, বড় অজগর, হরিণ, মেছোবাঘ ইত্যাদি। বৃক্ষরাজির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সেগুন, গর্জন, গামারি, চাপালিশ, তেলসুর, জারুল, লোহাকাঠ, ছাতিয়ান, গুটগুটিয়া ইত্যাদি। বাংলাদেশের বিরল প্রজাতির বৃক্ষ এবং প্রাণীর জন্য হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু বিরল প্রজাতির বৃক্ষ বৈলামও আছে এ অভয়ারণ্যে। এ বৃক্ষের উচ্চতা প্রায় ১০০ মিটার। সুউচ্চ বিরল প্রজাতির এ বৃক্ষটি হাজারিখিল ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোথাও দেখা যায় না। রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় বনছাগলও।
অভয়ারণ্য এলাকায় ঢুকেই দেখবেন হাতের বামপাশে বিশাল চা বাগান। আর ডানপাশে সিঁড়ি বেয়ে উঠেই বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ছাউনি। এখানে হারিয়ে যাবেন চা বাগানের বাতাস আর মাঝের দৃষ্টিনন্দন সড়কের মায়ায়।
যারা অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন তাদের জন্য হাজারিখিলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখানে তাঁবু খাটিয়ে রাত্রি যাপন এবং ট্রি একটিভিটিজ এর ব্যবস্থা। যার জন্য আপনাকে সাহসী হতে হবে। সকাল হলেই করতে পারবেন ট্রি একটিভিটিজ। ট্রি একটিভিটিজ করার জন্য আপনাকে জ্যাকেট, হেলমেট সব পরিয়ে দেওয়া হবে নিরাপত্তার জন্য। চমৎকার এক এডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা হবে আপনার। আপনি যে দিক দিয়ে হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য কেন্দ্র যান না কেন পাহাড়ি উঁচু নিচু,আঁকা-বাঁকা পথ পাড়ি দিয়েই আপনাকে পৌঁছাতে হবে। হাজারিখিল পৌঁছানোর পর আপনি যদি রাত্রি যাপনের ইচ্ছা করেন তাহলে এখানে কোন হোটেল মোটেল এর দেখা পাবেন না। সে জন্য আপনাকে থাকতে হবে তাঁবুর নিচে। একটু রাত হলেই তাঁবুর নিচের নিভু নিভু আলো। আলো আধারে তাঁবুগুলো বর্ণনাহীন সৌন্দর্য অন্যরকম রূপ নেয়। ঝিঁঝিঁ পোকার ঝিঝি শব্দ আর ব্যাঙ্গের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ডাকে হারিয়ে যাবেন প্রকৃতির কাছে। সব ক্লান্তি যেনো নিমিশেই দূর। রাতের এই অনুভূতি আপনাকে মুগ্ধতায় ভরিয়ে দিবে। কপাল ভালো হলে বন্যপ্রাণীর শব্দ,আর সাথে তো থাকছেই নীরবতা,প্রকৃতির অপার সান্নিধ্য। আপনি নিজে কথা বললেই প্রতিধ্বনি পাবেন। বন-জঙ্গলের আদিম বুনো প্রকৃতি।
যাওয়ার উপায়:
যে ঢাকার ফকিরাপুল, সায়দাবাদ, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এ চট্টগ্রামগামী বাসগুলো পেয়ে যাবেন। এস আলম, শ্যামলী, সৌদিয়া, ইউনিক, হানিফ, ঈগল, এনা, সোহাগ টি আর প্রভৃতি এসি ও নন-এসি বাস চট্টগ্রাম যায় প্রতিদিন।
চট্টগ্রামের যেকোনো স্থান থেকে আপনাকে যেতে হবে চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন মোড়ে। অক্সিজেন থেকে ফটিকছড়ির বাস পাবেন। নামতে হবে বিবিরহাট। বিবিরহাট নেমে রোডের উল্টো দিকে সিএনজিতে হাজারিখিল বাজার পর্যন্ত যাবেন। বাজার থেকে অভয়ারণ্য ১০ মিনিটের পথ।
থাকার উপায়:
হাজারিখিল অভয়ারণ্যে রাতে ক্যাম্পিং করে না থাকতে চাইলে আপনাকে চট্টগ্রাম শহরে ফিরে আসতে হবে থাকার জন্য। চট্টগ্রামে নানান মানের হোটেল আছে । চট্টগ্রাম শহরে এসে যে কোনো একটা হোটেলে দরদাম করে উঠতে পারেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন