কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি, চট্টগ্রাম
পার্বত্য জেলা চট্টগ্রামের সৌন্দর্যের যেন কোনো শেষ নেই। আকর্ষণীয় পর্যটন নিদর্শনে ভরপুর পাহাড় কন্যা চট্টগ্রাম। পাহাড়, সাগর, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক,বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য, ঝাউবন, ঝুলন্ত সেতু, সমুদ্রবন্দর- কি নেই এখানে। অসংখ্য দেখার মত জায়গায় ভরপুর চমৎকার এই জেলাটি।পাহাড়, হ্রদ, সবুজ বনানী ঘেরা এই জেলাটির অনবদ্য সুন্দর জায়গাগুলো মায়ায় বেঁধে রাখে ভ্রমণ পিপাসুদের। আর তাই তারা সুযোগ পেলেই ছুটে যায় চট্টগ্রামের রূপে মুগ্ধ হতে। চট্টগ্রামের দেখার মত এক জায়গা হল কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি। শান্ত-স্নিগ্ধ প্রকৃতি-মোড়া এই সমাধিস্থলটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন এখানে আগত দর্শনার্থীরা।
চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্র বাদশা মিয়া চৌধুরী সড়কে পাহাড়ের ঢালে এই ওয়ার সিমেট্রি টির অবস্থান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই অঞ্চলে মৃত্যু বরণকারী সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর ৭৫৫ জন বীর যোদ্ধার সমাধিস্থল এটি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা ক্যাম্পাসের পাশেই এই ওয়ার সিমেট্রিটি আজো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত আর নির্মমতার কিছু চিহ্ন ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। সবুজে ঘেরা এক মনোরম পরিবেশ এই ওয়ার সিমেট্রির চারপাশে। দেখে মনে ঠিক যেন মনোরম কোনো সাজানো বাগান। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কিছু বেদনা বিধুর ইতিহাসের স্মৃতি চিহ্ন এই প্রাঙ্গণ। পাহাড়ের কোলে শান্ত, নিরিবিলি, শ্যামল ছায়ায় এই সিমেট্রিতে ঘুমিয়ে আছেন নিহত সেনা ও বিমান বীর যোদ্ধারা।
সাত একর জায়গা-জুড়ে বিস্তৃত এই সিমেট্রির চারপাশ অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এখানে গাছে গাছে ফুলের সমারোহ। এমনকি মাঝে মাঝে দেখা মিলবে পাখিদেরও। দুই একটা পাখির ডাক ছাড়া পুরো সিমেট্রি জুড়ে অপার নীরবতা।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নিহত সৈনিকদের জন্য এ সমাধিসৌধটি প্রতিষ্ঠা করে। প্রথম দিকে এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত প্রায় ৪০০ সৈন্যের সমাধি ছিল। বর্তমানে আরও ১৭ অজানা ব্যক্তিসহ মোট ৭৫৫ টি সমাধি রয়েছে। এই ৭৫১টি সমাধিতে রয়েছেন ১৪ জন নাবিক, ৫৪৩ জন সৈনিক এবং ১৯৪ জন বৈমানিক। যুদ্ধকালীন সমাধি ছাড়াও ৪টি সমাধি এ কবরস্থানে রয়েছে।
এই নাগরিকদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের ৩৭৮ জন, কানাডার ২৫ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৯ জন, নিউজিল্যান্ডের ২ জন, অবিভক্ত ভারতের (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) ২১৪ জন, পূর্ব আফ্রিকার ১১ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৯০ জন, বার্মার ২ জন, নেদারল্যান্ডসের ১ জন ও জাপানের ১৯ জন। বিশ্বযুদ্ধের পরে অতিরিক্ত মৃতদেহ লুসাই, ঢাকা, খুলনা, যশোর, কক্সবাজার, ধোয়া পালং, দোহাজারি, রাঙ্গামাটি, পটিয়া এবং অন্যান্য অস্থায়ী সমাধিস্থান থেকে এই সমাধিস্থানে স্থানান্তর করা হয়। এ সমাধিটি কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেইভস কমিশন রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে।
এই সিমেট্রি মূল গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে সমাধিগুলোর মাঝখানে বিশালাকারের একটি ক্রুশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে । ফটকের দুই দিকে লাল ইটের গাঁথুনি ও কাঠের ছাউনির ছোট্ট দুটি দোচালা কুটির। দক্ষিণ পাশের কুটিরে সংরক্ষিত রয়েছে মেমোরিয়াল বুক। এখানে বিশ্বযুদ্ধের বাণিজ্যিক নৌবহরে যে সাড়ে ৬ হাজার নাবিকের সলিল সমাধি হয় তাদের নাম-পদবি লেখা রয়েছে। পূর্ব দিকে চোখে পড়ে ছোট একটি প্রার্থনা ঘর । সেখানে দেখতে পাবেন বাংলা ও ইংরেজিতে তৎকালীন ইতিহাস ও মানচিত্র।
এখানকার শ্যামল প্রকৃতিঘেরা নিরিবিলি শান্ত পরিবেশ আপনার মনে সৃষ্টি করবে প্রাশান্তিময় অনুভূতি। কোলাহলহীন স্নিগ্ধ প্রকৃতির মাঝে এই সমাধিস্থল কালের সাক্ষী হয়ে আজো বহন করছে ইতিহাসের কিছু পাতা। এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে অনুভব করতে পারবেন নীরবতায় জীবনের গভীর মর্মার্থ।
প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এবং বিকেলে ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এটি উন্মুক্ত থাকে।
যেভাবে যাবেন
ঢাকার ফকিরাপুল, সায়দাবাদ, মহাখালী বাস-স্ট্যান্ড থেকে চট্টগ্রাম-গামী যেকোনো বাসে করেই পৌঁছতে পারেন চট্টগ্রাম। এস আলম, শ্যামলী, সৌদিয়া, ইউনিক, হানিফ, ঈগল, এনা, সোহাগ টি আর প্রভৃতি এসি ও নন-এসি বাস চট্টগ্রাম যায় প্রতিদিন। এরপর জিইসি মোড় থেকে পূর্বদিকে প্রবর্তক মোড়ের আগে বাদশা মিয়া চৌধুরী সড়ক ধরে একটু গেলেই দেখতে পাবেন সবুজে ঘেরা কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন